আমাদের এই নগরে

রচনা : মোস্তফা কামাল

প্রযোজনা : রফিক উদ্দিন আহমেদ

কাহিনী সংক্ষেপ : দুই ছেলে এক মেয়ে আর স্ত্রী আরিফা বেগমকে নিয়ে নিয়ামত আলী খানের সংসার। স্কুলে শিক্ষকের চাকরি আর সামান্য জমিজমার আয় দিয়ে টানেমানে চলতো তার সংসার। তিনি অবসরে যাওয়ার পর সংসারে যখন টানাপড়েন শুরু হলো ঠিক তখনই হাল ধরলো তার বড় ছেলে মাসুদ আলী খান। সবাইকে নিয়ে এলো ঢাকায়। কিন্তু তার স্ত্রী সাকেরা কিছুতেই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলো না। পরিবারে শুরু হয়ে গেলোঅন্তর্দ্বন্দ্ব।

এক পর্যায়ে নিয়ামত আলী খান স্ত্রী আর ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাসা থেকে চলে যান। অথচ তখন তাদের আয়ের কোনো উৎস ছিল না। তিনি নিজে টিউশনি করাতে শুরু করলেন। ছেলে মাহমুদ আলীও ক্লাশের ফাঁকে ফাঁকে টিউশনি করাতো। এই করে চললো বেশ কিছুদিন। তারপর মাহমুদ আলীর চাকরির সুবাদে এলো তাদের সুদিন।

এই সুদিন দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা তা নিয়ে নিয়ামত আলী ও আরিফার মনে শঙ্কা। এই সুখ কপালে সইবে তো! মাহমুদ আলীকে বিয়ে করালেই তো সব সুখ নিঃশেষ হয়ে যাবে! অথচ পরে দেখা গেলো মাহমুদ আলীর স্ত্রী পুরো পরিবারে একজন জনপ্রিয় মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। আর তার কারণে পুরো পরিস্থিতিটাই গেলো পাল্টে। অবশেষে সাকেরাও তার ভুল বুঝতে পারলো। এই নগরীর এক মধ্যবিত্ত পরিবারের দ্বন্দ্ব সংঘাত, টানাপড়েন আর দুঃখ সুখের ইতিবৃত্ত উঠে এসেছে এই নাটকে।

বিভিন্ন চরিত্র
১. নিয়ামত আলী খান, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বয়স ষাটের কোটায়।
২. আরিফা বেগম, গৃহিনী, বয়স পঞ্চাশের কোটায়।
৩. মাসুদ আলী খান, নিয়ামত আলীর বড় ছেলে। বয়স পঁয়ত্রিশের

কোটায়, চাকরিজীবী

৪. মাহমুদ আলী খান, নিয়ামত আলীর ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
৫. অনামিকা আলী, নিয়ামত আলীর মেয়ে, কলেজ ছাত্রী।
৬. সাকেরা বেগম, বয়স ত্রিশের কোটায়, গৃহিনী, মাসুদ আলীর স্ত্রী
৭. সাকিমুন, বয়স আট বছর, মাসুদ আলী ও সাকেরার মেয়ে
৮. আলী আকবর, নিয়ামত আলীর শ্যালক, বয়স চল্লিশের কোটায়।
ঠোটকাটা স্বভাবের মানুষ। কথায় আঞ্চলিকতার টান।
৯. রফিকুল হক, ব্যাংকের কর্মকর্তা। বয়স পঞ্চাশের কোটায়।
১০. সায়মা ইয়াসমিন, রফিকুল হকের স্ত্রী। বয়স পয়তাল্লিশ।
১১. শাওন, রফিকুল হকের মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।
আরো অনেকে।

দৃশ্য – ১
চরিত্র : মাসুদ আলী খান ও সাকেরা বেগম
স্থান : মাসুদ আলীর বেডরুম, সময়: সন্ধ্যা।
মাসুদ আলী ও সাকেরা চা খেতে খেতে গল্প করছিল। এসময় সাকেরা কথাটা তুললো।
সাকেরা : তুমি যদি মনে কিছু না করো তাহলে আমি একটা কথা বলবো।
মাসুদ আলী : কি কথা।
সাকেরা : আগে বল, কিছু মনে করবে না।
মাসুদ আলী : ঠিক আছে, মনে কিছু করবো না।
সাকেরা : যা আয়-ইনকাম করছো সবই তো খরচ হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার জন্য কিছু জমাটমা করো!
মাসুদ আলী : কিভাবে করবো? সংসারের এতো খরচ!
সাকেরা : খেয়ে দেয়ে জীবন পার করলে তো হবে না। ভবিষ্যতের জন্য তো কিছু করতে হবে।
মাসুদ আলী : তাই বলে না খেয়ে তো থাকা যাবে না।
সাকেরা : দরকার হলে কম খাবো। তারপরও মাসে অন্তত কিছু টাকা জমাতে হবে।
মাসুদ আলী : যখন সম্ভব হবে তখন জমাবো। এখন সম্ভব নয়।
সাকেরা : কেন সম্ভব নয়?
মাসুদ আলী : দেখছো না, সংসারের কত খরচ!
সাকেরা : খরচ কমাও।
মাসুদ আলী: কিভাবে কমাবো?
সাকেরা: মাকে বল কম কম খরচ করতে।
মাসুদ আলী : মা কি বেশি বেশি খরচ করছেন?
সাকেরা : আমার তো তাই মনে হয়।
মাসুদ আলী : তোমার কথা শুনলে মেজাজ গরম হয়ে যায়।
সাকেরা : সত্য কথা বললেই তো তোমার মেজাজ গরম হয়।
মাসুদ আলী : সাকেরা! এই সংসারটা তোমার একার নয়…মা এই সংসারের
ঘানি টানতে টানতে এই পর্যন্ত এসেছেন। আর তুমি এসেই….
সাকেরা: বল, থামলে কেন?
মাসুদ আলী কোনো কথা বলে না। সে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে যায়। তার দিকে তাকিয়ে থাকে সাকেরা।

দৃশ্য – ২
চরিত্র : নিয়ামত আলী ও আরিফা।
স্থান : নিয়ামত আলীর শোবার ঘর। সময় : রাত
নিয়ামত আলী একটি বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলেন। এসময় তার পাশে গিয়ে
বসলেন আরিফা। তার মনটা ভালো নেই। নিয়ামত আলী তার দিকে তাকিয়েই তা বুঝতে পারলেন।
নিয়ামত আলী : কি হলো? তোমার কি মন খারাপ?
আরিফা : আমাদের মন খারাপ ভালোতে কি আসে যায়!
নিয়ামত আলী : কেন, একথা বলছো কেন? কিছু হয়েছে নাকি?
আরিফা : সে কথা জেনে কি হবে? আপনার আয়-ইনকাম থাকলে না হয় কথা ছিল।
নিয়ামত আলী : আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। খুলে বলো তো, কি হয়েছে!
আরিফা : বউমার কথাবার্তা আর শুনতে ইচ্ছা করে না। স্রেফ গা জ্বলে।
নিয়ামত আলী : কি বলে?
আরিফা : বউমা বলে, সাকিমুনের বাপের একার ইনকামে সংসার চলে। সব
কিছু কম কম খরচ করবেন! যেন আমি একাই খাই, আর কেউ খায় না।
নিয়ামত আলী : মাসুদের ইনকামে সংসার চলে। কাজেই ওর বউর কথা তো একটু শুনতেই হবে।
আরিফা : কেন, বউর কথা শুনতে হবে কেন? মাসুদ আমাদের ছেলে না! তার জন্য আমরা কষ্ট করি নাই? আমরা খাইয়া না খাইয়া থাকি নাই!
নিয়ামত আলী : করছি। সেটা কি আর সবাই মনে রাখে?
আরিফা : রাখবে না কেন? সারা জীবন আমরা কেবল কষ্ট করেই যাবো? সুখের মুখ দেখবো না?
নিয়ামত আলী : আরে কি হয়েছে! কষ্ট মনে করলেই কষ্ট। না করলে কিছু না।
আর বউমা কি বললো, না বললো ও নিয়ে তুমি ভেবো নাতো!
আরিফা: বউমা যদি গণ্ডমুর্খ হতো তাহলে ভাবতাম না। একটা শিক্ষিত মেয়ের আচার ব্যবহার এমন হবে কেন?
নিয়ামত আলী : শিক্ষিত তুমি কাকে বলো? পাঠ্যপুস্তক পড়ে সার্টিফিকেট জোগাড় করলেই কি শিক্ষিত হওয়া যায়?
আরিফা : খুব ভালো বলেছো তো!
নিয়ামত আলী : তুমি মোটেই চিন্তা করো না। মাহমুদ, অনামিকা পড়াশুনা শেষ করুক; তারপর আমরাও চিন্তা করবো এখানে থাকবো কিনা…তুমি আমার সম্পর্কে জানো না? আমি কি কারো কথা সহ্য করার মানুষ! তারপর নিয়ামত আলী আরিফার হাত ধরে বললেন, প্লিজ, মন খারাপ করো না..

দৃশ্য – ৩
চরিত্র : মাসুদ, মাহমুদ, সাকেরা ও অনামিকা
স্থান : ডাইনিং রুম, সময় : সকাল
মাসুদ নাশতা খাচ্ছে। ও অফিসে যাবে। মাহমুদ ও অনামিকা নাশতার জন্য বসে আছে। ওরা ক্লাশে যাবে।
মাহমুদ : ভাবি, আমাদের ক্লাশ আছে। তাড়াতাড়ি নাশতা দাও তো!
সাকেরা : দাঁড়াও, তোমার ভাইয়া অফিসে যেয়ে নিক, তারপর দিচ্ছি।
মাহমুদ : ভাইয়ার অফিসে যাওয়ার সাথে নাশতার কি সম্পর্ক?
সাকেরা : তা তুমি বুঝবে না।
মাসুদ : এখানে বোঝার তো কিছু নেই। নাশতা চেয়েছে নাশতা দেবে।
সাকেরা: চোখ গরম করে মাসুদের দিকে তাকালো। অনামিকা রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল। তাকে বাধা দিয়ে সাকেরা বললো, এই! কি হয়েছে? কোথায় যাচ্ছো?
অনামিকা : চোখ গরম করে কথা বলবেন না তো ভাবি!
সাকেরা : তুমি যে আমাকে ধমকের সুরে কথা বললে!
অনামিকা : কোথায় ধমকের সুরে কথা বললাম?
সাকেরা : আমি চোখ গরম করলাম কোথায়?
মাসুদ : প্লিজ চুপ করো সবাই। তোমরা কি শুরু করেছো এসব! সাকেরা, তুমি ওদেরকে তাড়াতাড়ি নাশতা দাও। ঝগড়াটা কিন্তু তুমিই বাধালে…
সাকেরা: কী! আমি বাধালাম?
মাসুদ : হ্যাঁ, তুমিই বাধিয়েছো।
অনামিকা : না না, ভাবির কোনো দোষ নেই। ঝগড়া আমরাই বাধিয়েছি।
মাসুদ : (চোখ গরম করে) এই চুপ! অনামিকা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। মাহমুদ নাশতা না করেই বেরিয়ে যায়। মাসুদও অফিসের ব্যাগ হাতে নিয়ে মেজাজ খারাপ করে বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য- ৪
চরিত্র : মাহমুদ, শাওন, শাওলি ও আতাউল।
স্থান : টিএসসির মোড়ে ডাসের সামনে। সময় : সকাল।
শাওন ওর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নিয়ে নাশতা করছিল। হঠাৎ কোথা থেকে যেন আসে মাহমুদ। ও শাওনের প্লেট থেকে একটি স্যান্ডইউশ নিয়ে খাওয়া শুরু করে।

শাওন : আরে মাহমুদ! তুমিও কি সকালে নাশতা না করেই বেরিয়েছো?
মাহমুদ : ইতিবাচক মাথা নাড়ে।
শাওন : কেন? খালাম্মা তো নাশতা না করে বাড়ি থেকে বের হতে দেন না। আজ কেন ব্যতিক্রম হলো?
মাহমুদ : পরে বলবো।
শাওলি : আমরা কি যাবো?
মাহমুদ : না না প্লিজ!
শাওন : আর অর্ডার দেবো?
মাহমুদ : দরকার নেই। চায়ের অর্ডার দাও।
আতাউল : আমরা চা নিচ্ছি না। ক্লাশে দেরি হয়ে যাবে।
শাওন : ওকে। দেখা হবে তাহলে..
শাওলি : হাত নেড়ে বিদায় নেয়।
মাহমুদ : আজ ভাবি খুব খারাপ ব্যবহার করেছে।
শাওন : কেন?
মাহমুদ : ভাইয়া নাশতা করছে। তখন আমি বললাম, আমার ক্লাশ আছে। আমাকেও নাশতা দেন। সে রেগে গিয়ে বললো, তোমার ভাইয়া
অফিসে যেয়ে নিক, তারপর..
শাওন : বলো কী! ভাইয়া কি করলেন?
মাহমুদ : ভাইয়া ভাবিকেই দুষলেন। কিন্তু অনামিকা কথা বলতে গিয়ে তার ধমক খেল। মেজাজটাই গরম হয়ে গেলো।
শাওন : আর তাই তুমি নাশতা না করেই চলে এসেছো।
মাহমুদ : ইতিবাচক মাথা নাড়ে।
শাওন : খালাআম্মার মনটা নিশ্চয়ই আজ খুব খারাপ হয়েছে?
মাহমুদ : হুঁ। জাকগে, চল এবার।
শাওন : কোথায়?
মাহমুদ : ক্লাশে যাবে না?
শাওন : পরের ক্লাশটা সাড়ে ১২টায়। তাই তো এখানে এলাম।
মাহমুদ : তাহলে ওখানটায় গিয়ে বসি।
শাওন : তা বসা যেতে পারে।
মাহমুদ : আচ্ছা, মেয়েরা এমন কেন বলতো!
শাওন : তুমি ভাবিকে দিয়ে সবাইকে এক পাল্লায় মেপ না। সব মেয়েরা এক না।
মাহমুদ : ভাবি, মা আর অনামিকাকে একেবারেই পছন্দ করতে পারেন না। এটা কী! তারও তো মা বোন আছে; নাকি!
শাওন : সেটা চিন্তা করলে কি কেউ এমন আচরণ করে?
মাহমুদ : দেখ, তুমি আবার এমন করো না যেন! তাহলে আমার মা বাবার আর কষ্টের সীমা থাকবে না।
শাওন : আমার আচার আচরণে কি তা মনে হয়েছে? তাছাড়া আমি তো আগেই তোমাকে বলেছি, আমি যেদিন তোমার বাবা মাকে আমার নিজের বাবা মা বলে জানতে পারবো সেদিনই তোমার বাড়িতে আমি যাবো। তার আগে নয়।
মাহমুদ : তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার নেই।
শাওন : আমি শুধু তোমার সহযোগিতা চাই। (তারপর শাওন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে) চল এবার। ক্লাশ শুরু হতে কয়েক মিনিট বাকি। মাহমুদ ও শাওন হাঁটতে থাকে।

দৃশ্য – ৫
চরিত্র : মাসুদ আলী, সাকেরা ও সাকিমুন
স্থান : মাসুদ আলীর বেডরুম, সময় : রাত সাকেরা মুখ গোমরা করে শুয়ে আছে। সাকিমুন ওর টেবিলে কি সব আঁকিউঁকি করছে। এসময় ওর বাবা ঘরে ঢোকেন। সাকিমুন ঘুমায়নি দেখে অবাক হয়ে মাসুদ আলী ওকে ডাকে।
মাসুদ : মামণি, তুমি এখনও ঘুমাওনি!
সাকিমুন : ঘুম আসছে না বাবা।
মাসুদ : কেন?
সাকিমুন : আমার মন খারাপ।
মাসুদ : কেন তোমার মন খারাপ মামনি?
সাকিমুন : জানো বাবা, মামণি আজ দীদার সাথে ঝগড়া করেছে।
মাসুদ : কেন?
সাকিমুন : জানি না। দীদাকে মামণি চলে যেতে বলেছে।
মাসুদ : কি ব্যাপার সাকেরা, কি হয়েছে?
সাকেরা : কিছু হয়নি।
মাসুদ : কিছু হয়নি মানে! সাকিমুন যা বলছে তা কি মিথ্যে?
সাকেরা : তোমার মেয়েকে এখন এসবই শেখানো হয়। মায়ের বিরুদ্ধে নালিশ করছে মেয়ে!
মাসুদ : সাকিমুন, তোমাকে কি কেউ এসব শিখিয়েছে?
সাকিমুন : কে শেখাবে বাবা? আমি তো নিজের চোখে দেখলাম। মা দীদার সাথে প্রত্যেক দিনই খারাপ ব্যবহার করে। বড়দের সাথে ঝগড়া করা কি ভালো, বলো! আমার টিচার বলেছেন, বড়দের সাথে ঝগড়া করতে নেই। বড়দের মুখে মুখে কথা বলতে নেই।
সাকেরা : (উত্তেজিত হয়ে) এই মেয়ে! তুই বেরিয়ে যা আমার রুম থেকে!
সাকিমুন : মেয়ে বেরুবে কেন? তুমিই বেরিয়ে যাও।
সাকেরা : কি আমি বেরিয়ে যাব? ঠিক আছে, আমিই যাচ্ছি। তুমি থাকো তোমার বাবা মা নিয়ে!
মাসুদ : (সাকেরা বেরিয়ে যেতে উদ্যত, এমন সময় তার হাত ধরে মাসুদ বলে) দেখ, এতো রাতে সিন ক্রিয়েট করবে না। তোমার এই বাড়াবাড়ি আমার আর সহ্য হচ্ছে না।
সাকেরা : বাড়াবাড়ি আমি করছি, নাকি তুমি!
সাকিমুন : মামনি, রাগ করো না। বাড়াবাড়ি কিন্তু তুমিই করছো! সাকেরা কষিয়ে মেয়েকে একটা চড় দিয়ে বললো, বেয়াদব মেয়ে! বেশি পাকনা হয়েছো তাই না? সাকিমুন দীদা দীদা বলে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকে। মাসুদ ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সাকেরার দিকে তাকিয়ে থাকে।

দৃশ্য – ৬

চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, মাহমুদ ও অনামিকা

স্থান : নিয়ামত আলীর ঘর। সময় : সকাল দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে খাটের ওপর শুয়ে শুয়ে পত্রিকা পড়ছিলেন নিয়ামত আলী। তার পাশে বসে আছেন আরেফা। অন্য পাশে মাহমুদ ও অনামিকা বসেছে।

আরিফা : আমরা যখন এই সংসারের অশান্তির কারণ তখন আমাদের চলে যাওয়া উচিত।
নিয়ামত আলী : উচিত তো অনেক কিছুই; কিন্তু কোথায় গিয়ে উঠবে? বাড়ি ভাড়া দেবে কি দিয়ে? খাবে কি? আছে কোনো ব্যবস্থা?
আরিফা : এতো অপমানের পরও আমরা এখানে থাকবো? তোমরা থাকো, আমার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব না। কথায় কথায় বউমা অপমান করবে আর তা আমরা মুখবুজে সহ্য করবো?
মাহমুদ : বাবা, আমি একটি প্রস্তাব দেই?
নিয়ামত আলী : কি প্রস্তাব?
মাহমুদ : আপাতত আমরা একরুমের একটি বাসা ভাড়া নেই।
নিয়ামত আলী : একরুমের হলেও তার ভাড়া দেয়া লাগবে না?
মাহমুদ : লাগবে, সেটা ম্যানেজ করা যাবে। আমি টিউশনির সংখ্যা বাড়িয়ে নেবো।
নিয়ামত আলী : খাওয়া লাগবে না?
মাহমুদ : লাগবে। আমি যদি একটা পার্টাইম জব পেয়ে যাই তাহলে আর সমস্যা হবে না।
নিয়ামত আলী : পেয়ে গেলে, যদি না পাও? তখন কি হবে? না খেয়ে ধুকে ধুকে মরতে হবে।
অনামিকা : হবে না বাবা। প্রয়োজন হলে আমিও টিউশনি করবো। আপনি করবেন। মা না পারলেও আমরা তিনজনে তো আয় করতে পারবো? সেই আয় দিয়ে চারজনের চলে যাবে।
নিয়ামত আলী : তার মানে সবাই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে প্রস্তুত।
আরিফা : এবার বোঝ, সবাই কতটা ত্যক্ত-বিরক্ত।
নিয়ামত আলী : তাহলে কি মাসুদ আমাদের চলে যাওয়ার কথা বলবো?
অনামিকা : না বাবা, দরকার নেই।
আরিফা : সাকিমুনের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। ও খুব কষ্ট পাবে। সারাক্ষণ দীদা দীদা করে পাগল করে ফেলে। আমার সময় যে কিভাবে কাটবে…

নিয়ামত আলী : এসব কথা বলে কি কোনো লাভ আছে? তুমিই তো চলে যেতে চাও। আবার এসব বলছো কেন?

অনামিকা : আচ্ছা বাবা চলে যাবে বলে কি কথাও বলতে পারবে না?
নিয়ামত আলী : খামোখা আবেগের কথা বলে কি লাভ? আবেগ আর বাস্তবতা
কি এক? শোন মাসুদের মা, তুমি যাবে কিনা ঠিক করে বলো।

আরিফা : যাবো না কেন?

নিয়ামত আলী : মাহমুদ, তাহলে আমরা বাসা দেখি। একরুমের কোথায়

পাওয়া যায়? আজ সবাই মিলে বের হবো নাকি একবার?

মাহমুদ : হওয়া যায়। অনামিকা তুও চল।
অনামিকা : ঠিক আছে যাবো।

দৃশ্য- ৭
চরিত্র : সাকেরা ও সাকিমুন
স্থান : সাকেরার বেডরুম। সময় : বিকেল
সাকিমুন টিভিতে কার্টুন ছবি দেখছিল। এসময় ওকে ডাকে সাকেরা।
সাকেরা : সাকি, এই সাকিমুন!
সাকিমুন : আমাকে মেরে আবার এতো আদর করে ডাকছো কেন?
সাকেরা : আর মারবো না। আয়, আমার কাছে আয়।
সাকিমুন : (সাকেরার কাছে আসতে আসতে) বল কি বলবে।
সাকেরা : আমার ওপর খুব রেগে আছিস তাই না?
সাকিমুন : হ্যাঁ।
সাকেরা : কেন?
সাকিমুন : তুমি আমাকে মেরেছো কেন?
সাকেরা : আমি তোর মা। তুই আমার পক্ষ না নিয়ে তোর দীদার পক্ষ নিলি

কেন?

সাকিমুন : তুমি দীদার সাথে সারাক্ষণ ঝগড়া করো কেন?
সাকেরা: কিন্তু আমি তো তোর মা!
সাকিমুন : তাতে কি হয়েছে! তোমার চেয়ে দীদা অনেক ভালো। দীদা

আমাকে খুব আদর করে।

সাকেরা : (ক্রোধের দৃষ্টিতে সাকিমুনের দিকে তাকিয়ে) সাকি! মায়ের

চেয়ে মাসির দরদ বেশি মনে হচ্ছে!

সাকিমুন : তুমি এসব কি বলছো। আমি কিন্তু দীদাকে বলে দেবো।
সাকেরা : (রেগে) যা এখনই যা। আমি তোর মা না। তুই রুম থেকে যা।
সাকিমুন : চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বের হয়।

দৃশ্য – ৮
চরিত্র : মাসুদ ও আলী আকবর
স্থান : মাসুদের অফিস। সময় : দুপুর।
মাসুদ আলী খানের অফিসে আসবে আলী আকবর। অফিসের সামনের এসে

গেটে মাসুদকে খোঁজ করবে।

আলী আকবর : এই যে ভাই, এইটা আমার ভাগিনার অফিস না? ভাগিনা

আছে?

জনৈক : আপনার ভাগিনা কে?
আলী আকবর : আরে! আমার ভাগিনাকে চেনেন না! তাইলে খারায়া আছেন

কেন?

জনৈক : আরে! নাম বলবেন তো!
আলী আকবর : এতোবার আসলাম গেলাম। আর আমার ভাগিনারে চেনেন না।

আপনারে চাকরি দিছে কে? যত্তোসব উজবুকের দল!

জনৈক : কি বললেন!
আলী আকবর : না না, কিছু না। (এদিক সেদিক তাকিয়ে অফিসে ঢুকে

যায়) ভাগিনা, ও ভাগিনা! ভাগিনা আছো নাকি?

মাসুদ আলী : কে আকবর মামা? এসো এসো।
আলী আকবর : আর কি আসবো। মন মেজাজ খুব খারাপ।
মাসুদ আলী : কেন মামা?
আলী আকবর : কি আর কমু। সম্পর্কে মামা। কইতেও পারি না আবার সইতেও

পারি না।

মাসুদ আলী : না না মামা, তুমি বলো।
আলী আকবর : তুমি নাকি বউমার আচলের মধ্যে ঢুইকা গেছো?
মাসুদ আলী : মানে!
আলী আকবর : তুমি নাকি বউমার কথায় ওঠো আর বসো, ওঠো আর বসো?
মাসুদ আলী : মামা, দুষ্টামি করছো?
আলী আকবর : আরে কিসের দুষ্টামি! তোমার সাথে দুষ্টামি করবো কোন

দুঃখে?

মাসুদ আলী : তাইলে খুইলা বলো। আচলের মধ্যে ঢোকার মতো কি হইলো?
আলী আকবর : তোমার বউ, আমার বোন-বোনজামাইরে তাড়াইয়া দিতেছে।

আর তুমি হা কইরা দেখতেছো!

মাসুদ আলী : কি বলো মামা!
আলী আকবর : তোমার অবস্থা দেইখা মনে হইতেছে তুমি কিছুই জানো

না!

মাসুদ আলী : মামা, তুমি বিশ্বাস করো। আমি এসবের কিছুই….
আলী আকবর : জানো না তো! হইছে, বাদ দাও। তুমি বাড়ি গিয়া আমার
বোনের সাথে কথা কইবা। তারা যাতে বাড়ি থেকে না যায় সেই
ব্যবস্থা করবা। বুঝলা কি কইলাম?

মাসুদ আলী: ঠিক আছে মামা। মামা, লাঞ্চ করে যাও?
আলী আকবর : (হাসি দিয়ে) করাবে নাকি? (পজ) ঠিক আছে। চল, তোমার

সাথে একটু ভালোমন্দ খাই।

দৃশ্য – ৯

চরিত্র : মাহমুদ ও শাওন।
স্থান : ক্যাম্পাস, সময় : বেলা ১১টা।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে শাওন ওর বান্ধবীদের সাথে কথা বলছিস। এসময় ও

মাহমদুকে দেখে ওর কাছে এগিয়ে যায়।
শাওন : তুমি সকালের ক্লাশটি মিস দিয়েছো তাই না?
মাহমুদ : আর বলো না। সকালে বাসা ঠিক করতে গিয়েছিলাম। একরুমের

একটা বাসা পেয়েছি। পেয়েই এ্যাডভান্স করে দিয়েছি।

শাওন : একরুমের বাসায়…
মাহমুদ : আগে তো মাথা গোচার ঠাই হোক; তারপর দেখা যাবে।
শাওন : তাহলে ভাইয়ার বাসা ছেড়ে দিচ্ছো?
মাহমুদ : এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সব সময় কম্প্রোমাইজ করে চলা

যায় না।

শাওন : এটা তোমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ!
মাহমুদ : তুমি পাশে থাকবে তো! নাকি আমার করুণ অবস্থা দেখে কেটে

পড়বে?

শাওন : তোমার কি মনে হয়?
মাহমুদ : আমার ওপর কি আর সব কিছু নির্ভর করে! লোকে বলে, নারীর মন না

যেন কচু পাতার পানি!

শাওন : তোমার কাছে কি আমার মনটাও কচু পাতার পানির মতো মনে

হয়েছে?

মাহমুদ : না না, তা মনে হয়নি।
শাওন : তাহলে এসব বলছো কেন?
মাহমুদ : সরি, আর বলবো না।
শাওন : এটা মনে থাকে যেন। (পজ) নতুন বাসায় কবে যাচ্ছো?
মাহমুদ : কালই।
শাওন : তাই নাকি! তাড়াহুড়া হয়ে যাচ্ছে না?
মাহমুদ : যাচ্ছে। কিন্তু ওই বাসায় একেবারে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। মনে হয় দম
বন্ধ হয়ে মারা যাবো। ওই বাসা থেকে যত তাড়াতাড়ি বের হতে
পারবো ততই মঙ্গল।

শাওন : বুঝেছি। মন একবার উঠে গেলে আর ফেরানো যায় না।
মাহমুদ : তুমি আসবে? না থাক, আমরা ঠিকঠাক করে নিই, তারপর এসো।
শাওন : ঠিক আছে। আবার ক্লাশ শুরু হয়ে যাচ্ছে। চল যাই।
ওরা দুজনেই ক্লাশের দিকে হাঁটা দেয়।

দৃশ্য – ১০
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, মাহমুদ, অনামিকা, সাকিমুন ও সাকেরা।

স্থান : মাসুদ আলীর বাড়ি। সময় : বিকেল।
ব্যাগ গুছিয়ে বাইরে বের হতে উদ্যত নিয়ামত আলী, আরেফা, মাহমুদ ও

অনামিকা। এমন সময় আরেফা সাকিমুনকে ডাকলেন।

আরিফা : সাকিমুন! সাকিমুন!!
সাকিমুন : দীদা..(দৌড়ে এসে) একি! তোমরা কোথায় যাচ্ছো?
আরিফা : (সাকিমুনকে জড়িয়ে ধরে, এসময় তার চোখে পানি আসে)।
সাকিমুন : দীদা! কি ব্যাপার কি! তুমি কাঁদছো কেন?
আরিফা : সাকি, আমরা চলে যাচ্ছি! আবার কবে কখন দেখা হয়! তুমি কিন্তু
মামণির কথা শুনবা! তার অবাধ্য হবা না। আমি দোয়া করি দীদু।
তুমি অনেক বড় হও। অনেক বড়!

সাকিমুন : (নিজের চোখ দিয়ে পানি পড়ে। কিন্তু সে দীদার চোখের পানি
মুছতে মুছতে বলে), দীদা, তুমি যাবে না। তুমি আমাকে ছেড়ে
কোথাও যাবে না! (কাঁদে)

আরিফা : দীদা লক্ষি, কাঁদে না। আমি আবার আসবো। এসে তোমাকে

নিয়ে যাবো।

সাকিমুন : না, আমি এখনই তোমার সাথে যাবো। (কাঁদে) তারপর ও ওর মার

রুমে গিয়ে তাকে ডেকে এনে বলে,

মামণি, দীদাকে তুমি যেতে দিও না। দীদা চলে গেলে আমিও কিন্তু
চলে যাবো! ফুমণি, তুমিও আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছো! (কাঁদতে
থাকে, কিন্তু সাকেরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।)

নিয়ামত আলী : দাদুভাই, আর কাঁদে না। এবার শান্ত হও। শান্ত হয়ে আমাদের

বিদায় দাও!

সাকিমুন : না! তোমরা কেউ যাবে না! কেউ না!
সবাই ওর সাথে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতেই বিদায় নেন নিয়ামত আলী,

আরেফা, মাহমুদ ও অনামিকা।

দৃশ্য – ১১
চরিত্র : মাসুদ, সাকেরা ও সাকিমুন
স্থান : মাসুদের বাড়ি, সময়: বিকেল।
মাসুদ অফিস থেকে বাসায় ফেরে। বাসায় বাবা মাকে না দেখে উদ্বেগের
সাথে বাড়ির কক্ষগুলোতে যায়। তারপর সাকেরার কাছে আসে।
মাসুদ : সাকেরা, মা, বাবা কাউকে দেখছি না যে! কোথায় গেছেন তারা?
সাকিমুন : বাবা, বাবা… দীদা, দাদুভাই, চাচ্চু, ফুমনি সবাই চলে

গেছে।

মাসুদ : সাকেরা, তুমি কিছু বলছো না যে! কোথায় গেছেন বাবা মা!

সাকেরা : জানি না।
মাসুদ : জানো না মানে!
সাকেরা : তারা এই বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। কোথায় গেছেন বলে যাননি।
মাসুদ : কি বলো তুমি! কেন গেছেন, কোথায় গেছেন! তুমি তাদের

কাছে জানতেও চাওনি?

সাকিমুন : মামনি কিছু বলেনি। যেতেও বাধা দেয়নি।
মাসুদ : সাকেরা, সাকেরা, তুমি বাবা মাকে বিদায় দিতে পারলে! তুমি
জানো তারা আমাকে কত কষ্ট করে মানুষ করেছেন! বাপ দাদার জমি
বিক্রি করে, খেয়ে না খেয়ে আমাকে পড়াশুনা করিয়েছেন। আর আজ
বৃদ্ধ বয়সে তারা আমার কাছ থেকে কিছুই পাবে না! তারা এখন
কার কাছে যাবে? কোথায় পাবে মাথা গোজার ঠাই! না না! এটা
আমি মানতে পারছি না। আমার বাবা মা যদি এ বাড়িতে থাকতে
না পারেন তাহলে কে পারবে! তুমিও পারবে না। বেরিয়ে যাও! তুমি
বেরিয়ে যাও! তোমাকে আর আমি দেখতে চাই না। সাকি, তুমি
তোমার মাকে চলে যেতে বলো। আর না হয় আমি একটা অঘটন
ঘটিয়ে বসবো!

সাকিমুন : মামনি, তুমি দীদা আর দাদুভাইকে নিয়ে এসো। বাবা খুব

কষ্ট পাচ্ছে। যাও না মা!

মাসুদের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। সাকিমুন তার কাছে গিয়ে
চোখের পানি মুছে দেয়। মাসুদ সাকিমুনকে বুকে টেনে নেয়।

দৃশ্য – ১২
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, মাহমুদ ও অনামিকা
স্থান : মাহমুদদের বাসা। সময় : বিকেল
মাহমুদ পার্টাইম চাকরির জন্য একটা ইন্টারভিউ দিয়েছে। ইন্টারভিউটা
ভালো হয়েছে। খবরটা দেওয়ার জন্য সকাল সকাল বাসায় ফেরে। কিন্তু
বাসায় ওর বাবাকে না দেখে অনামিকাকে জিজ্ঞাসা করে।
মাহমুদ : অনামিকা, বাবাকে দেখছি না যে! কোথাও গেছে নাকি?
অনামিকা : হ্যাঁ, টিউশনি করাতে।
মাহমুদ : কোথায় গেছে!
অনামিকা : টিউশনি করাতে।
মাহমুদ : বলিস কী!
অনামিকা : হ্যাঁ, বাবা দু দুটি টিউশনি করাচ্ছেন।
মাহমুদ : এই বয়সেও বাবার যদি টিউশনি করিয়ে আমাদের খাওয়াতে হয়
তাহলে আর আমাদের বেঁচে থেকে কী লাভ! মা মা, আপনি কিছু
বললেন না?

আরিফা : কি বলবো বল! ঢাকা শহরে কোনোমতে খেয়েপড়ে থাকতেও অনেক

খরচ!

মাহমুদ : তাই বলে বাবা টিউশনি করাবেন! না না মা, এ আমি মানতে

পারছি না। আমার খুব খারাপ লাগছে।

অনামিকা : ভাইয়া, তুমি মন খারাপ করো না। তোমার চাকরিটা হলে
বাবাকে টিউশনি করতে হবে না। (এসময় কলিং বেল বাজে।
অনামিকা দরজা খোলার জন্য এগিয়ে যায়, দরজা খুলে) ও, বাবা?

নিয়ামত আলী : কিরে, তোর ভাই এসেছে?
অনামিকা : হ্যাঁ বাবা।
নিয়ামত আলী : (ঘরের ভেতরে এগিয়ে গিয়ে) মাহমুদ, তোর ইন্টারভিউ কেমন

হলো রে!

মাহমুদ : খুব ভালো হয়েছে বাবা। কিন্তু যে যুগ পড়েছে! শেষ পর্যন্ত

চাকরিটা হয় কিনা কে জানে!

নিয়ামত আলী : হবে হবে! আজ না হোক কাল তোর চাকরি হবেই।
মাহমুদ : দোয়া করেন বাবা! আমার চাকরি হলে আপনাকে আর একটুও কষ্ট

করতে দেবো না।

নিয়ামত আলী : হুঁ! তোমার বউ এসে যদি বাড়ি থেকে বের করে দেয় তখন!
মাহমুদ : (আবেগময় কণ্ঠে) বাবা! সেরকম যদি হয় তাহলে আমার যেন মরন হয়।
নিয়ামত আলী : তোর যেন সে রকম না হয়। এই বুড়ো বয়সে আমি
টিউশনি করাতে যাই কি সাধে! শোন মাহমুদ, তোর চাকরি হলে
আমরা কিন্তু একটা ভালো বাসা ভাড়া নেবো, কি বলিস?

মাহমুদ : অবশ্যই বাবা।
আরিফা : অনামিকা, তোর বাবার কথা শুনছিস?
অনামিকা : হ্যাঁ মা। ভাইয়ার চাকরি হলে সত্যি সত্যি আমরা একটা ভালো বাসায় যাবো। সবার মুখে হাসি ফুটে ওঠলো।

দৃশ্য – ১৩
চরিত্র : মাসুদ ও আলী আকবর।
স্থান : আলী আকবরের অফিস, সময় : সকাল
আলী আকবর অফিসে আসে দেরি করে। কিন্তু মাসুদ সকালে ফোন করে যেনে
নেয় তার অফিসের ঠিকানা। তারপর সকালেই তার অফিসে গিয়ে
হাজির হয়। আলী আকবরের জন্য অপেক্ষা করে। আলী আকবর তড়িঘড়ি
করে অফিসে আসে। মাসুদকে দেখে ও অবাক হয়।

আলী আকবর : আরে আরে ভাগিনা তুমি! তুমি এতো সকাল সকাল এসে
বসে আছো? আমার বোন দুলাভাইকে নিয়া কোনো সমস্যায়

পড়েছে? আরে! তুমি দেখি কোনো কথাই কও না! কি সমস্যা
কইয়া ফালাও! আমি সব সমাধান কইরা দিমু।
মাসুদ : (আবেগময় কণ্ঠে) মামা, মা বাবা চলে গেছে!
আলী আকবর : কি, কি বললা! তারা চইলা গেছেন! কোথায় গেছে?
মাসুদ : জানি না।
আলী আকবর : তোমারে আগেই বলছিলাম। আমার কথায় কোনো কান দেও
নাই। এখন বোঝ! যাকগে, তুমি বাড়িতে খোঁজ খবর নিছিলা?
মাসুদ : না। আমাদের বাড়ির ঘরটাও তো ওতো সুবিধার না। বাড়িতে

গিয়েই বা তারা থাকবেন কি করে?

আলী আকবর : তারপরও তুমি একবার ঘুরে আসো। আমিও ঢাকায় কোথায়
উঠতে পারে খোঁজ খবর নিয়ে দেখি। আচ্ছা শোন, মাহমুদ
ইউনিভার্সিটিতে যায় না?

মাসুদ : নিশ্চয়ই যায়।
আলী আকবর : (চিন্তা করে) তুমি বাড়িতেই যাও। আর আমি এদিকে খোঁজ
করে দেখি। যাও যাও। আর চিন্তা করার সময় নাই। আরে আরে! বস বস।
তুমি আমার অফিসে প্রথম আসছো। চা পানি খাওয়াবো না।
কইরে ফাকু, আমার ভাগিনারে চা বিস্কুট আর এক গ্লাস পরিস্কার
পানি দে। শোন, আমারেও দিস।

তারপর টেবিল গোছাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে আলী আকবর।

দৃশ্য – ১৪
চরিত্র : মাহমুদ ও শাওন।
স্থান : ক্যাম্পাস, সময় : দুপুর।
ক্লাশ থেকে বের হয় শাওন। ওর জন্য বারান্দায় অপেক্ষা করে মাহমুদ। শাওন ওকে

দেখে ওর কাছে আসে।
শাওন : কি ব্যাপার, ক্লাশ করলে না!
মাহমুদ : না। কাল তো আমাদের শেষ ক্লাশ, কাল সবগুলো করবো।
শাওন : কোথাও কাজ ছিল।
মাহমুদ : হুঁ, ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম।
শাওন : কোথায়?
মাহমুদ : একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে।
শাওন : কেমন হলো?
মাহমুদ : ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে। কিন্তু চাকরিটা হয় কিনা জানি না।

কারণটা নিশ্চয়ই আর ব্যাখ্যা করতে হবে না!

শাওন : এখন বলতে পারো, চাকরিটা হচ্ছে ভাগ্য। তোমার ভাগ্যে যখন চাকরি

জুটবে তখনই তুমি চাকরি পাবে।

মাহমুদ : ঠিক বলেছো। কিন্তু চাকরিটা যে আমার বড় প্রয়োজন! টিউশনি

শেষ করে বাড়ি যাওয়ার পর আর পড়তে ইচ্ছা করে না।

শাওন : এতো কিছু ভেব না তো! মনে সাহস রাখ দেখবে, সব ঠিক হয়ে

গেছে।

মাহমুদ : সারাক্ষণই তো মনটাকে শক্ত করে রাখি। কিন্তু মনটা কেবল দুরু দুরু
করে। জাকগে, এখন আমি যাই। তিনটায় একটা টিউশনি আছে।

শাওন : তিনটায়! কেন তিনটায় কেন?
মাহমুদ : চারটা টিউশনি। ঘুরে ঘুরে পড়াতে তো আর কম সময় যায় না!
শাওন : হুঁ।
মাহমুদ : ওকে, তাহলে কাল দেখা হবে। আমি গেলাম। বাই।
শাওন : (হাত নেড়ে) বাই।

দৃশ্য – ১৫
চরিত্র : মাসুদ ও অন্যান্য
স্থান : গ্রাম, সময় : বিকেল।
মাসুদ পায়ে হেঁটে বাড়িতে যায়। রাস্তায় দুএকজন পরিচিত লোকের সাথে
দেখা হয়। কুশল বিনিময় হয়। আবার হাঁটে। ইতিমধ্যেই ও বাড়িতে
গিয়ে পৌছে। ওদের ভাঙাচোড়া একটা টিনের ঘর। ঘরের সামনের
দরজায় তালা ঝোলানো। মাসুদ ঘরের সামনে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর আবার রওয়ানা হয় ঢাকার দিকে।

দৃশ্য – ১৬
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, মাহমুদ ও অনামিকা
স্থান : মাহমুদদের ঘর। সময় : রাত।
আরিফা রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত। অনামিকা তাকে সহায়তা করছে।
নিয়ামত আলী বসে বসে পান চিবাচ্ছেন। এসময় কলিং বেলের শব্দ।
নিয়ামত নিজেই দরজা খোলার জন্য এগিয়ে যান।
নিয়ামত আলী : ও মাহমুদ, আজ এতো দেরি হলো যে!
মাহমুদ : রাতের টিউশনিটা শেষ করতে দশটা বেজে যায়।
নিয়ামত আলী : দশটা পর্যন্ত টিউশনি! দশটা পর্যন্ত টিউশনি করে পড়াশুনা

করবি কখন?

মাহমুদ : কিছু করার নেই বাবা!
নিয়ামত আলী : কিছু করার নেই মানে! আমি কি মরে গেছি! সংসার

নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই পড়াশুনা শেষ কর।

মাহমুদ : বাবা, আপনি টিউশনি করছেন একথা শুনেই আমার খারাপ লাগছে।

সারা জীবন আপনি কষ্টই করে যাবেন!

নিয়ামত আলী : এ এমন কি কষ্ট! আমি তো বসেই থাকি।
অনামিকা : (এগিয়ে এসে) কি বাবা, কি নিয়ে কথা বলছেন?
নিয়ামত আলী : তুই কি জানিস, মাহমুদ টিউশনির সংখ্যা বাড়িয়েছে?
অনামিকা : বাবা আপনি তো সারাদিনই টিউশনি করছেন!
মাহমুদ : কি! বাবা সারাদিনই টিউশনি করে!
আরিফা : (খাবার টেবিলের সামনে থেকে) মাহমুদ, সারাদিন পর বাসায়

এসেছিস। এখন খেতে আয়তো। খেতে খেতে কথা বলছি।
মাহমুদ : মা, বাবা এতো কষ্ট করছে আপনি কিছু বলেন না?
আরিফা : অনামিকা এ নিয়ে অনেক কথা বলেছে। কিন্তু তোর বাবার কোনো

ভ্রুক্ষেপ নেই।

নিয়ামত আলী : মাহমুদ, আমি তো এখনও সবল সুস্থ আছি নাকি! আমার
তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তোর চাকরিটা হোক, তারপর না
হয় টিউশনি ছেড়ে দেবো।
অনামিকা : বাবা, কথাটা যেন মনে থাকে।
নিয়মত আলী : থাকবে রে থাকবে।
তারপর ওরা সবাই খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো।

দৃশ্য – ১৭
চরিত্র : মাসুদ ও অন্যান্য
স্থান : ঢাকা শহর। সময় : দিন।
মাসুদ প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ।
মাহমুদের খোঁজ পায় না। শহরের বিভিন্ন স্থানে ওর বাবা মাকে
খোঁজে। কিন্তু কোথাও তাদের সন্ধান পায় না।

দৃশ্য – ১৮
চরিত্র : মাসুদ, সাকিমুন ও আলী আকবর
স্থান : মাসুদের বাসা, সময় : রাত।
মাসুদ ড্রয়িং রুমে বসে আছে। বসে বসে সে ভাবছে। তার পাশে বসে
আছে সাকিমুন। সে তার দীদার কাছে যাওয়ার জন্য মাসুদের কাছে
বায়না ধরে।
সাকিমুন : বাবা, বাবা..
মাসুদ : বল।
সাকিমুন : আমার দিকে তাকাও না বাবা..।

মাসুদ : এই তাকালাম। এবার বল।
সাকিমুন : তোমার কি মন খারাপ?
মাসুদ : ইতিবাচক মাথা নাড়ে।
সাকিমুন : আমারও খুব মন খারাপ।
মাসুদ : কেন?
সাকিমুন : আমার খুব দীদাকে দেখতে ইচ্ছা করছে।
মাসুদ : তোমার দীদাকে তো খুঁজে পাচ্ছি না। কোথায় যে গেলো!
সাকিমুন : বলো কি বাবা! দীদাকে খুঁজে পাচ্ছো না! আমি দীদার কাছে
যাবো..দীদাকে খুঁজে বের কর। (সাকিমুনের চোখ জলে ভরে যায়)
মাসুদ : কত জায়গায় খুঁজলাম। কোথাও পাচ্ছি না। দাঁড়াও দেখি। মামাকে

ফোন করি।

(মাসুদ ডায়াল ঘুরিয়ে আলী আকবরকে ধরে।)
আলী আকবর : না রে মামা। কোথাও পাচ্ছি না। বাড়িতে তো যায়নি না?
চিন্তা কইরো না। আমার মন বলতেছে তাদেরকে খুইজা পাইবো।
দেখা যাক। রাখি তাইলে।

ফোন রেখে মাসুদ ভাবে।

দৃশ্য – ১৯
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, মাহমুদ ও অনামিকা,
স্থান : মাহমুদের বাসা। সময় : রাত।
বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছেন নিয়ামত আলী। তার পাশে বসে আছেন
আরিফা। মাহমুদ আর অনামিকা মেঝেতে বসে পত্রিকার পাতা
ওল্টাচ্ছিল। এসময় কথাটা তোলে মাহমুদ।
মাহমুদ : বাবা, আমার হাতটা দেখেন তো!
নিয়ামত আলী : কেন রে!
মাহমুদ : আমার চাকরিটা কবে হবে?
নিয়ামত আলী : এটা কি হাত দেখে বলা যায়?
মাহমুদ : আপনি না হাত দেখতে পারেন!
নিয়ামত আলী : আরে! আমি ওতো পাকা জ্যোতিষী নাকি?
অনামিকা : বাবা, আপনি আমাকে না বললেন, আমি এক চাঞ্চে এমএ পাস
করবো। তারপর আমার একটা ভালো চাকরিও হবে। সেটা কি করে
বললেন?

নিয়ামত আলী : এটা কি করে বললাম? ধারণা থেকে বললাম। তুই খুব উদ্যমী

মেয়ে তো!

অনামিকা : ভাইয়ার কি কম উদ্যমী?
নিয়ামত আলী : না না।
অনামিকা : তাহলে ভাইয়াকেও বলো।

আরিফা : আহা, এতো করে বলছে, দেখই না হাতটা! একটা সান্তনাও তো

দিতে পারো।

নিয়ামত আলী : আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। দে তো বাবা তোর হাতটা!
মাহমুদ : না থাক, দেখতে হবে না। শুধু সান্তনা দেয়ার জন্য আমার হাত দেখতে

হবে না।

নিয়ামত আলী : আহা রাগ করছিস কেন। দে দে। আমি যা বলি, তা কিন্তু ফলে-
অনামিকা : হ্যাঁ ভাইয়া। বাবার কথা কিন্তু ফলে।
মাহমুদ : (হাত বাড়িয়ে দিয়ে) এই নিন। দেখেন।
অনামিকা : বাবা, হাতের রেখাতে যা আছে তাই কিন্তু বলবেন। ঠিক আছে?
নিয়ামত আলী : (হাতটা উল্টেপাল্টে দেখে) হুঁ, তোমার লাইফ লাইন বেশ ভালো।
ঘন ঘন বিদেশ সফরের সম্ভাবনা। আমার মনে হয়, তোমার চাকরিটা
বিদেশী কোনো সংস্থায় হবে। কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই
তোমার বিয়েটা হয়ে যাবে।

অনামিকা : বাবা, ভাইয়ার বউ কেমন হবে? সে কি বড় ভাবীর মতো হবে?

নাকি অন্যরকম হবে?

নিয়ামত আলী : (হেসে) এ ও কি বলা যায় রে মা?
অনামিকা : কেন বলা যায় না বাবা! হাতে কি এসব রেখা নেই। মানুষে যে

বলে, অমুকের স্ত্রী ভাগ্য ভালো। অমুকের স্বামী ভাগ্য ভালো।

আরিফা : (মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে) নিশ্চয়ই অন্য রকম হবে। নিশ্চয়ই সে

তোকে নিজের বোনের মতো জানবে।
মাহমুদ : বাবা, বলেন না, আমার চাকরিটা কবে হবে?
নিয়ামত আলী : শিগগিরই হবে। কিন্তু তোমার মনোবলটা বাড়াতে হবে। তা

না হলে কিন্তু কিছু হবে না।
অনামিকা : ভাইয়া, বাবার কথাটা মনে রেখো…
মাহমুদ : মনে মনে যেন সংকল্প করলো।

দৃশ্য – ২০
চরিত্র : মাসুদ ও সাকেরা
স্থান : মাসুদের শোবার ঘর। সময়: রাত।
রাতের খাবার শেষে মাসুদ শোবার ঘরের বিছানায় এসে দেয়ালে হেলান দিয়ে
বসে। ও মন মরা হয়ে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর ওর কাছে আসে
সাকেরা।

সাকেরা : কি ব্যাপার, তোমার মন খারাপ?
মাসুদ : হুঁ।
সাকেরা : কি হয়েছে, অফিসে কোনো সমস্যা?
মাসুদ : বুঝতে পারছি না। খামোখাই সমস্যার সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সাকেরা : তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না।

মাসুদ : নানা ছুতোই চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো হচ্ছে।
সাকেরা : বল কী! তোমার চাকরির এদিক সেদিক কিছু একটা হলে

আমাদেরকে যে পথে বসতে হবে!
মাসুদ : হুঁ। কিন্তু তোমার কি সে চিন্তা আছে?
সাকেরা : কেন? আমার চিন্তা নেই, একথা তোমাকে কে বললো?
মাসুদ : সে চিন্তা থাকলে কি কেউ বাবা মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়!
সাকেরা : এই একটা কথা ছাড়া আর কোনো কথা নেই তোমার?
মাসুদ : আমার মাথার মধ্যে এটাই সারাক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে মা

বাবাকে আমরা অবহেলা করছি বলেই নানা সমস্যা হচ্ছে।

সাকেরা : কোন কথা বলে না। অন্যদিকে চলে যায়।
মাসুদ : সাকেরা, আমার কথা তুমি শুনছো না? ভালো কথা শুনবে কেন?
তারপর মাসুদ বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে।

দৃশ্য – ২১
চরিত্র : সাকেরা, সাকিমুন ও নিয়ামত আলী।
স্থান : উত্তরার বাজার। সময় : সকাল
সাকিকে নিয়ে বাজারে যায় সাকেরা। তরিতরকারি মাছ কেনাকাটা করে।
হঠাৎ তার চোখে পড়ে নিয়ামত আলীকে। নিয়ামত আলী মাছ
দামাদামি করছিলেন। অবশেষে পকেটের অবস্থা দেখে কম দামে কিছু
ছোট মাছ আর অল্প কিছু তরকারি কিনেছেন। সে আড়াল থেকে
নিয়ামত আলীকে ফলো করতে করতে তার হাঁটতে থাকে। সাকিমুন
কিছুই বুঝতে পারে না। সেও হাঁটে।
সাকিমুন : মা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
সাকেরা: কোথাও যাচ্ছি না।
সাকিমুন : তাহলে ওই দিকে যাচ্ছো কেন?
সাকেরা : আমার একটা কাজ আছে। কাজটা সেরেই বাসায় চলে যাবো।
সাকিমন : কি কাজ?
সাকেরা : এতো কথা বলিস না তো?
সাকি চুপ করে থাকে। সাকেরা নিয়ামত আলীর বাসাটা দেখে আবার

নিজের বাসার দিকে ফিরে যায়।

দৃশ্য – ২২
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, মাহমুদ ও অনামিকা।
স্থান : নিয়ামত আলীর বাসা, সময় : রাত।

নিয়ামত আলী টিউশনি শেষ করে বাসায় ঢুকছিলেন। এমন সময় মাহমুদ
মিস্টির প্যাকেট হাতে করে বাসায় ঢোকে। মিস্টির প্যাকেট দেখে
বিস্ময়কর একটা হাসি দিয়ে এগিয়ে গেলেন মাহমুদের কাছে।

নিয়ামত আলী : কিরে মাহমুদ! সুখবর আছে মনে হয়?
মাহমুদ : বাবা, আপনাকে আর টিউশনি করতে হবে না?
নিমায়ত আলী : বুঝেছি, তোর চাকরি হয়েছে! নিশ্চয়ই খুব ভালো চাকরি!
মাহমুদ : হ্যা বাবা, খুব ভালো চাকরি।
নিয়ামত আলী: এবার, আমরা একটা ভালো বাসা নেবো। কি বলিস?
মাহমুদ : হ্যা বাবা। ভালো দেখে একটা বাসা নেবো।
নিয়ামত আলী : অনামিকা, অনামিকা!
অনামিকা : (দরজা খুলেই) কি ব্যাপার বাবা, আপনাকে খুব উৎফুল্ল মনে
হচ্ছে? ভাইয়ার হাতে মিস্টি…ওহ! বুঝেছি। ভাইয়ার চাকরি
হয়েছে..তাই না? মা মা…

আরিফা : (দরজার সামনে এসে) কি রে.. (নিয়ামত আলী ও মাহমুদ ঘরে

ঢোকে) হও! মাহমুদের চাকরিটা তাহলে হয়েছে!

মাহমুদ : (মিস্টির প্যাকেট খুলে একটা মিস্টি হাতে নিয়ে) মা, হা করো

তো!

আরিফা হা করলে মিস্টি মুখে দেয় মাহমুদ। তারপর একে একে নিয়ামত ও

অনামিকার মুখে দেয়।

দৃশ্য – ২৩
চরিত্র : শাওন ও মাহমুদ
সময় : বিকেল, স্থান : টিএসসি চত্বর।
শাওন ফুল হাতে টিএসটির ক্যাফেটোরিয়ার সামনে অপেক্ষা করে। কিছুক্ষণ

পর মাহমুদ আসে।

শাওন : কনগ্রাচ্যুলেশনস! (হাতে ফুল তুলে দিয়ে) চাকরির প্রথম দিনের

অভিজ্ঞতাটা বলতো?

মাহমুদ : খুব ভালো। প্রথম দিন বেশ ভালো কেটেছে। আমি সত্যিই হ্যাপি!
শাওন : আসলেই তোমার ওপর মা বাবার দোয়া আছে।
মাহমুদ : ঠিক বলেছো। এখন মা বাবার জন্য কিছু করতে হবে।
শাওন : হুঁ। তাঁদের প্রতি কোনোরকম অবহেলা করা চলবে না।
মাহমুদ : এজন্য তোমার সহযোগিতা সবচে বেশি দরকার।
শাওন : তাতে আমি কোনো কার্পন্য করবো না। কিন্তু আমার সম্পর্কে তারা

কিছু জানেন?

মাহমুদ : অনামিকা নিশ্চয়ই বলেছে।
শাওন : আমিও তোমার কথা মাকে বলেছি।
মাহমুদ : কি বলেছো?

শাওন : আমি তোমাকে পছন্দ করি।
মাহমুদ :তাই!
মাহমুদ শাওনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। শাওনও ওর দিকে তাকায়।

দৃশ্য- ২৪
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা ও অনামিকা।
নিয়ামত আলী ও অনামিকা নতুন একটা বাসা দেখে বাসায় ফিরেছে। এ
বিষয়ে কথা বলার জন্য ঘরের মেঝেতে বসেছে অনামিকা। আরিফা
আর নিয়ামত আলীর মনের মধ্যে অন্যরকম আনন্দ। এই মোক্ষম
সময়টাকে বেছে নেয় অনামিকা।

অনামিকা : এই আনন্দের মুহূর্তে একটা কথা বলি?
নিয়ামত আলী : কি কথা মা বল..
অনামিকা : আগামী মাসে আমরা নতুন বাসায় যখন উঠছি; আমাদের

ফ্যামিলির নতুন সদস্যটিকে নিয়ে উঠলে কেমন হয়?

আরিফা : তোর প্রস্তাবটা মন্দ না।
নিয়ামত আলী : কিন্তু..
আরিফা : আপনি ভয় পাচ্ছেন মনে হয়?
নিয়ামত আলী : হুঁ, মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ভয়!
অনামিকা : ওসব ভয় করে লাভ নেই বাবা। চার আঙ্গুল কপালে যা আছে তাই

হবে।

নিয়ামত আলী : তারপরও জেনেশুনে আবার বিষপান!
আরিফা : বিষপান না মধুপান তা তুমি কি করে জানো? তাছাড়া ছেলেকে

বিয়ে না করিয়ে পারবে?

অনামিকা : আমি বলি কি, আপনি শাওন আপুর বাবার কাছে ফোন করে

সরাসরি কথাটা বলেন। দেখেন ওদের মতামত কী!
আরিফা : কি ব্যাপার, আপনি চুপ করে আছেন যে!
নিয়ামত আলী : ঠিক আছে করবো।
আরিফা ও অনামিকা মনে মনে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন।

দৃশ্য – ২৫
চরিত্র : রফিকুল হক, সায়মা ইয়াসমিন ও শাওন।
স্থান : রফিকুল হকের বাসা, সময় : রাত।
রফিকুল হক ড্রয়িং রুমে বসে আছেন। সায়মা তার জন্য ফল কেটে

এনেছেন। ফল খেতে খেতে তিনি কথা শুরু করলেন। ’

রফিকুল হক : সায়মা, শাওন কোথায়?
সায়মা : ওর রুমে।
রফিকুল হক : ওকে ডাকো না, কথা বলি।
সায়মা : (গলা উঁচু করে) শাওন, শাওন…
শাওন : জি মা।
সায়মা : ড্রয়িং রুমে এসো। কি কথা বলবে?
রফিকুল হক : ও আসুক, তারপর বলি।
শাওন : মা, কিছু বলবে?
সায়মা : তোর বাবা বলবে। বস।
রফিকুল হক : শাওন, মাহমুদের বাবা ফোন করেছিলেন। তারা তোকে নিয়ে

যেতে চান। তোর যদি কোনো আপত্তি না থাকে..
শাওন : বাবা, অন্তত একটা অনুষ্ঠান তো করতে হবে!
রফিকুল হক : উনি বললেন, কোনো অনুষ্ঠানের দরকার নেই। তারা চারজন

আসবেন। এসে তোকে নিয়ে যাবেন।

সায়মা : ভালো কথা। শাওন,,তোর আপত্তি থাকার কোনো কারণ আছে?
শাওন : নীরব।
সায়মা : তুমি তাদেরকে আসতে বলো।
রফিকুল হক : শাওন..
শাওন : (মাথা নীচু করে) ঠিক আছে বাবা।
রফিকুল হক : আলহামদুল্লিাহ।
দৃশ্য – ২৬
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, রফিকুল হক, সায়মা ইয়াসমিন, মাহমুদ,

শাওন, অনামিকা ও অন্যান্য।
স্থান : রফিকুল হকের বাড়ি। সময় : রাত।
রফিকুল হকের বাসার ড্রয়িং রুমে সবাই বসে আছেন। পরস্পরের মধ্যে
কথাবার্তা বলছেন। কাজী সাহেব মাহমুদ ও শাওনের বিয়ের কাজ
শুরু করে দিয়েছেন। উৎসব মুখর পরিবেশ। বিয়ের কাজ শেষ হওয়ার পরই
শুরু হয় খাওয়া দাওয়া। তারপর রফিকুক হক তার মেয়েকে নিয়ামত আলী
খানের হাতে তুলে দেন।

রফিকুল হক : আমার মেয়েটাকে দেখবেন। ভুলভ্রুটি করলে মেয়ের মতো শাসন

করবেন।

সায়মা : আমরা এতোটুকু বলতে পারি, ও কোনো দিনও অবাধ্য হবে না।
নিয়ামত আলী : আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না। ও আমার আরেকটা
মেয়ে। মেয়ের মতোই থাকবে। আর যখন খুশি আসবেন। আজ
তাহলে আসি ভাই। খোদা হাফেজ।
তারপর তারা এক এক করে বাইরে বের হন।

দৃশ্য – ২৭
চরিত্র : মাসুদ, সাকেরা, সাকিমুন
স্থান : মাসুদের বাড়ি, সময় : দিন।
মাসুদ ড্রয়িং রুমে অলসভাবে বসে আছে। তার পাশে এসে বসেছে

সাকেরা। সে বাবাকে চিন্তিত দেখে জিজ্ঞাসা করে…

সাকেরা : কি হয়েছে? খুব টেনশন করছো মনে হয়?
মাসুদ : না, তেমন কিছু হয়নি।
সাকেরা : তাহলে এতো ভাবছো কি?
মাসুদ : মাহমুদ বিয়ে করেছে।
সাকেরা : মাহমুদ বিয়ে করেছে!
মাসুদ : হুঁ!
সাকেরা : ও বিয়ে করলো; তোমাকে জানালোও না!
মাসুদ : আমাকে কেন জানাবে? আমি বড় ভাই হিসেবে কিছু করতে

পেরেছি!

সাকেরা : তাই বলে তোমাকেও জানাবে না!
মাসুদ : (নীরব হয়ে বসে থাকে)
সাকেরা : (ওর পাশে বসে ওকে সান্তনার স্বরে বলে) আমার জন্য তুমি তোমার
প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছো। এজন্য আমার সাজাই
একমাত্র প্রাপ্য।

মাসুদ : সাকেরার দিকে তাকিয়ে থাকে।

দৃশ্য -২৮
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, শাওন ও অনামিকা।
স্থান : নিয়ামত আলীর বাড়ি, সময় : বিকেল।
নাস্তার টেবিলে সবাই বসেছেন। আর এক এক করে সবার সামনে নাশতা

তুলে দিচ্ছে শাওন।

শাওন : বাবা, রাতে কি খাবেন? কোন মাছ আপনার বেশি পছন্দ? মাংসের

মধ্যে কোনটা বেশি পছন্দ?

নিয়ামত আলী : (হাসি হাসি মুখ করে) কেন মা?
শাওন : বাবা, আমি এই কয়দিন মার কাছে রান্না শিখেছি। এখন আপনি
যেটা বলবেন সেটাই আমি মার মতো করে রান্না করতে পারবো।
নিয়ামত আলী : আমি তোমার কথা শুনেই খুশি হয়েছি। তোমার কিছু

করতে হবে না।

শাওন : না বাবা। আপনি বলেন। আপনি যা বলবেন আমি তাই রান্না করে

খাওয়াবো।

নিয়ামত আলী : তুমি অফিস করো। তারপর আবার রান্না করার সময় কোথায়?
শাওন : সময় আমি বের করে নেব।
অনামিকা : বাবা, ওই চাকরির অজুহাতে ভাবি হাতপা গুটিয়ে বসে থাকে

না।

আরিফা : বউমা বলে, মা, আপনার কিছু করতে হবে না। সব কাজ আমি আর

অনামিকা করবো। আপনি শুধু দেখিয়ে দেবেন।

নিয়ামত আলী : বউমাকে দেখেই আমি বুঝেছি, বউমা সবার মতো না।

একটু আলাদা।

শাওন : ধন্যবাদ বাবা। আমাকে শুধু দোয়া করবেন। আমি যেন সারা জীবন

আপনাদের মেয়ে হয়েই থাকতে পারি।

নিয়ামত আলী: আল্লাহ তোমাদের মঙ্গল করুক; মঙ্গল করুক!
আবেগে তার চোখ ভিজে আসে।

দৃশ্য – ২৯
চরিত্র : মাসুদ ও সাকেরা।
স্থান : মাসুদের বাসা। সময় : রাত।
মাসুদ ড্রয়িং রুমে একা বসে আছে। রুমের বাতিটা অফ করা। তার কাছে
আসে সাকেরা। মাসুদকে চিন্তিত দেখে তার কাছে এর কারণ
জানতে চায়।

সাকেরা : কিছুদিন ধরে দেখছি, তুমি শুধু টেনশন করছো। কারণটা কি

বলবে?

মাসুদ : আমার চাকরিতে ঝামেলা যাচ্ছে। কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।
আমার কেন জানি মনে হয়, মা বাবার দোয়া থেকে আমি বঞ্চিত
হচ্ছি। আর তা তোমার কারণে।
সাকেরা : এখন সব দোষ আমার।
মাসুদ : হ্যাঁ। সব দোষ তোমার। তোমার কারণেই আমার মা বাবা এখানে
থাকতে পারেননি। অথচ মাহমুদের বউ বাবা মাকে মাথায় করে
রাখছে। মেয়েটা বড় একটা চাকরি করে। তারপরও মাকে বাসায়
কোনো কিছু করতে দেয় না। সারাক্ষণ মা বাবার সেবায় ব্যস্ত। আর
তুমি চাকরি করলে যে কি করতে?
সাকেরা : দেখ এক হাতে তালি বাজে না!
মাসুদ : এক হাতে তালি বাজে না ঠিকই, কিন্তু তুমি তোমার দুই হাতে

তালি বাজিয়েছো। এখানে অন্য কারো হাত ছিল না!

সাকেরা : (কোনো কথা বলে না।)

মাসুদ : আমি যা বলি তা শোন। তুমি কালই বাবা মার বাসায় যাও। তাদের

পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাও। তা না হলে আর রক্ষা নেই।
সাকেরা : ঠিক আছে। দোষ যখন আমার, আমি যাবো।

দৃশ্য -৩০
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, অনামিকা ও শাওন
স্থান : নিয়ামত সাহেবের বাড়ি, সময় : বিকেল।
নিয়ামত আলী ও আরিফা তাদের ঘরে বসে আছেন। তাদেরকে চা দিয়েছে
শাওন। সে তার শশুর শাশুড়ির জন্য পোশাকাদি কিনেছে। সেগুলো তাদের
সামনে নিয়ে আসে। কিছুক্ষণ পর আসে অনামিকা।

শাওন : বাবা, দেখেন তো, এই পাঞ্জাবি পাজামা আপনার পছন্দ হয় কিনা..
নিয়ামত আলী : (বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে) কি ব্যাপার বউমা, হঠাৎ এসব

কেনাকাটা..

শাওন : আগে বলেন না বাবা, আপনার পছন্দ হয়েছে কিনা..
নিয়ামত আলী : অবশ্যই পছন্দ হয়েছে। কিন্তু এগুলো এখন কেন? কোনো

বিশেষ কারণ আছে?

শাওন : বলছি বাবা। মা, আপনার শাড়িটা পছন্দ হয়েছে?
আরিফা : এতো সুন্দর শাড়ি, পছন্দ হবে না!
শাওন : অনামিকা, কাছে এসো। এই দুটো থ্রিপিস তোমার আর আমার।

তোমার যেটা পছন্দ হয় সেটাই নাও।

অনামিকা : ভাবী!
শাওন : দেখ, তুমি সবার ছোট। তুমি আগে পছন্দ করো!
অনামিকা : ঠিক আছে, আমি..(একটা ড্রেস ধরে) আমি এটা নিচ্ছি।
শাওন : ধন্যবাদ। আর এই তোমার ভাইয়ার শার্টপ্যান্ট। কি বলো, পছন্দ হবে

তো!

অনামিকা : হবে না মানে! অবশ্যই হবে। আচ্ছা ভাবী, এবার বলো না, হঠাৎ

এতোসব..

শাওন : আমার প্রথম মাসের বেতন দিয়ে এসব কিনেছি।
নিয়ামত আলী : বউমা, তোমার মা বাবার জন্য কিছু কিনলে না?
শাওন : তাদের জন্য পরেও কেনা যাবে বাবা। বাবা, এই নিন আমার বেতনের

টাকা।

নিয়ামত আলী : আমার কাছে কেন দিচ্ছো মা!
শাওন : সংসারের খরচ লাগবে না!
নিয়ামত আলী : সংসার খরচের টাকা তো মাহমুদই দিচ্ছে। তোমার টাকাটা

জমা করে রাখো!
শাওন : বাবা, আপনি রাখেন তো!
আরিফা : রাখো না! বউমা খুশি হয়ে দিয়েছে!

শাওনের কাজ দেখে সবাই আবেগপ্রবণ হয়।

দৃশ্য – ৩১
চরিত্র : আলী আকবর ও সাকেরা।
সময় : বিকেল, স্থান : মাসুদের বাড়ি।
সাকেরা বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এমন সময় বাড়িতে এসে

হাজির হয়। বাড়ির বাইরে থেকেই চিৎকার দিয়ে ডাকে।

আলী আকবর : বউমা, বউমা! বউমা বাড়ি আছো?
সাকেরা : (ভ্রু কুচকে তাকিয়ে) পাগলা মামা আবার কোন মতলবে? (দরজা
খুলতে খুলতে) মামা, হঠাৎ কি কারণে? আপনি তো আবার ভাগ্নে
ছাড়া কিছুই বোঝেন না।

আলী আকবর : এবার আমি কিন্তু তোমার কাছেই আসছি। আমার একটা

কথা রাখবা? না রাখলে বলবো না। রাখলে বলবো।

সাকেরা : রাখবো মামা, আপনার সব কথা রাখবো। আপনি বসেন। চা

দিচ্ছি।

আলী আকরব: (হাসি ছড়িয়ে দিয়ে) চা দিবা। পারলে দুটো বিস্কুটও দিও।
শোন, দুধ চা দিয়ে টোস্ট বিস্কুট খুব মজা। তুমি খেয়েছো
কখনো?

সাকেরা : মামা টোস্ট নেই। আপনাকে ভালো বিস্কুট দিচ্ছি।
আলী আকবর : ঠিক আছে তাই দাও।
সাকেরা : (ফ্ল্যাক্সের গরম পানি দিয়ে চা বানাতে বানাতে) মামা, কি কথা

যেন বলবেন?

আলী আকবর : শোন বউমা, ছোট বউমা দুই দিন হইলো এই বাড়িতে
আসছে। আর সে দুই দিনেই সব ক্রেডিট নিয়া নিচ্ছে। এটা
কি মানা যায়? মাসুদও তো দেখি ছোট বউমার প্রশংসায়
পঞ্চমুখ।

সাকেরা : তাই নাকি মামা!
আলী আকবর : তুমি এই বাড়িতে আগে আসছো। আর ছোট বউমা
ক্রেডিট নিবো এইটা কি হয়? তুমি একটা কাজ করো। তুমি
তোমার শশুর শাশুড়িকে নিয়া আসো।

সাকেরা : নেন মামা চা নেন। (আলী আকবর চা দেয়) আর আপনার সুন্দর

প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ। আমি এখনই যাবো।

আলী আকবর : (হাস্যোজ্জল মুখে) সত্যি! সত্যি যাচ্ছো? যাও যাও। এখনই

যাও। আমি এখন আসি।

সাকেরা : ঠিক আছে মামা। আপনি আসবেন। খোদা হাফেজ!

দৃশ্য – ৩২

চরিত্র : সাকেরা, নিয়ামত আলী ও আরিফা।
সময়: বিকেল, স্থান : উত্তরা আবাসিক এলাকা।
সাকেরা রিকশা নিয়ে নিয়ামত আলীর বাসার খোঁজে বের হয়। সে যে
বাসাটি চিনতো সেই বাসায় আর ওরা থাকে না। তাদের কাছ
থেকে ঠিকানা নেয়। তারপর ওদের নতুন বাসায় এসে উপস্থিত হয়।

সাকেরা : কলিং বেল বাজিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
নিয়ামত আলী : (দরজা খুলে) ওহ তুমি! এসো এসো ভেতরে এসো। তারপর কি
খবর বলো তো?
সাকেরা : (পা ছুঁয়ে সালাম করে) বাবা, আপনি কেমন আছেন?
নিয়ামত আলী : আমি ভালো আছি মা। আরিফা, আরিফা..
আরিফা : (এগিয়ে এসে) ওহ বউমা!
সাকেরা : (তাকেও পা ছুঁয়ে সালাম করে) কেমন আছেন মা?
আরিফা : আল্লাহতায়ালা খুব ভালো রাখছে।
সাকেরা : মা, আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। প্লিজ
আমাকে ক্ষমা করেন। বাবা, আমি ভুল করেছি। আমি আপনাদের সাথে অন্যায়
আচরণ করেছি। সেজন্য আমি দুঃখিত। আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই।
নিয়ামত আলী : ঠিক আছে মা, ঠিক আছে।
সাকেরা : মা, আপনি ক্ষমা করেছেন তো?
আরিফা : হ্যাঁ করেছি।
সাকেরা : আমার মাথায় হাত দিয়ে বলেন।
আরিফা : বললাম তো করেছি।
সাকেরা : বাবা, মা, আমি এখন যাই।
নিয়ামত আলী : সেকি! চা খাবে না! একটু বসো। চা খেয়ে যাও।
সাকেরা : না বাবা। পরে আবার আসবো। মা, আমি আসি।
আরিফা ইতিবাচক মাথা নাড়েন।

দৃশ্য – ৩৩
চরিত্র : নিয়ামত আলী ও মাহমুদ
স্থান : ঢাকা শহরের সড়ক, সময় : বিকেল।
ছুটির দিন। বিকেলে নিয়ামত আলীর সাথে হাঁটতে বের হয় মাহমুদ। শাওন

সম্পর্কে ওর খুব জানতে ইচ্ছা করে।
মাহমুদ : বাবা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
নিয়ামত আলী : কি কথা বাবা, বলো।
মাহমুদ : বাবা, শাওন কেমন মেয়ে?
নিয়ামত আলী : তোমার কি খুব জানতে ইচ্ছা করছে?

মাহমুদ : হ্যাঁ বাবা। এক সময় ভাইয়ার বউয়ের যন্ত্রণায় আমাদেরকে বেরিয়ে
আসতে হয়েছিল। তাই মনের মধ্যে শুধু ভয়, শাওনও যদি আপনাদের
সাথে একই আচরণ করে!

নিয়ামত আলী : নারে বাবা, সেই ভয় আর নেই। শাওন খুব ভালো মেয়ে।
মাহমুদ : মা, অনামিকা কি বলে?
নিয়ামত আলী : ওরা কি বলবে? আমি দেখি না!
মাহমুদ : তারপরও..
নিয়ামত আলী : ওরা বলে, শাওন অন্যরকম মেয়ে। আর দশটা মেয়ের মতো না। ওর
আচার ব্যবহার কথাবার্তায় আমরা সবাই মুগ্ধ। সাকি এসেছিল
জানিস?
মাহমুদ : হ্যাঁ শুনেছি।
নিয়ামত আলী : ও বলে, ছোটমামনি, তুমি খুব ভালো। তুমি যদি আমার মা

হতে!! (নিয়ামত আলীর চোখে পানি আসে)

মাহমুদ : বাবা! (দুই হাত দিয়ে মাহমদু ওর বাবাকে ধরে।) এটাই আমার

প্রাপ্তি বাবা!

নিয়ামত আলী : তুই অনেক বড় হ বাবা। আমি দোয়া করি!
তারপর ওরা বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়।

দৃশ্য – ৩৪
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, সাকেরা, শাওন, অনামিকা ও সাকিমুন।
স্থান : মাসুদের বাসা। সময় : বিকেল।
শাওন বাসার সবার জন্য নাশতা তৈরিতে ব্যস্ত। তাকে সহায়তা করছে
অনামিকা। এ সময় কলিং বেলের শব্দ পেয়ে অনামিকা দরজা খুলতে
এগিয়ে যায়। দরজার ওপাশে মাসদু, সাকেরা ও সাকিমুন।

অনামিকা : (দরজা খুলেই) আরে সাকি!
সাকিমুন : ফুমনি! তুমি কেমন আছো?
অনামিকা : (সাকিকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে) ভালো। তুমি কেমন

আছো?

সাকিমুন : আমি! এখন বলবো না। দীদা কই?
সাকেরা : অনামিকা কেমন আছো?
অনামিকা : ভালো। আপনি?
সাকেরা : মোটামুটি। বাবা মা কোথায়?
অনামিকা : ভেতরের রুমে আছেন। (শাওনের দিকে তাকিয়ে) ভাবি, এদিকে

এসো।
শাওন : কে, কে এলো?
অনামিকা : বড় ভাবি।

শাওন : বড় ভাবি, ও!!
টেবিল সাজাতে ব্যস্ত শাওন। এদিকে সাকিমুন ওর দীদাকে খুঁজতে থাকে।
তাকে পেয়ে গলা জড়িয়ে ধরে রীতিমতো কান্না। এসময় সাকেরাও
আসে।

সাকেরা : আব্বা, মা আমি আপনাদের নিতে এসেছি। আমি বাসায়
একটা গেটটুগেদারের আয়োজন করেছি। প্লিজ আপনারা না করবেন না।
আরিফা : ঠিক আছে, তুমি বউমা আর অনামিকাকে বলো।
সাকেরা : আমি বলছি মা। আপনারা রেডি হন। বাবা, কই? চলেন!
নিয়ামত আলী : ছোট বউমা, ছোট বউমা!
শাওন : জি বাবা!
নিয়ামত আলী : বড়বউ মা আমাদের নিতে এসেছে। আমরা কি যাবো?
শাওন : যান না বাবা!
সাকেরা : শাওন, তোমারও যেতে হবে।
শাওন : আজ বাবা মা ঘুরে আসুক। আমরা আরেক দিন যাই!
আরিফা : তুমি না গেলে আমরাও যাবো না।
শাওন : আপনাদের ছেলে সন্ধ্যায় বাসায় আসবে। খুঁজে না পেলে আবার..
নিয়ামত আলী : বাসার একটা চাবি ওর কাছে তো আছেই। বাসায় একটা
চিরকূটে লিখে যাও যে আমরা মাসুদের বাসায় আছি। তাহলে ও ওই বাসায়
চলে যাবে।
শাওন : ঠিক আছে বাবা, আমি তাই করছি।
তারপর ওরা সবাই মাসুদের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

দৃশ্য -৩৫
চরিত্র : নিয়ামত আলী, আরিফা, মাসুদ, মাহমুদ, সাকেরা, শাওন, অনামিকা,
সাকিমুন ও আলী আকবর।
স্থান : মাসুদের বাসা। সময় : বিকেল।
বাসায় রান্না বান্নার ঘুম। নানা রকম আয়োজন করেছে সাকেরা। রান্নায়
সহায়তা করছে শাওন ও অনামিকা। সাকিমুন দীদাদীদুর সাথে গল্পে মত্ত।
এসময় বাসায় আসে মাসুদ। ও কলিং বেল দিতেই দরজা খুলতে এগিয়ে যায়
সাকিমুন।
সাকিমুন : (দরজা খুলেই) বাবা, তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।
মাসুদ : কি সারপ্রাইজ বাবা?
সাকিমুন : তুমি ভেতরে এসেই দেখ।
মাসুদ : বাড়িটা বেশ সরগরম মনে হচ্ছে! কে এসেছে রে সাকি!
সাকিমুন : ড্রয়িং রুমে এসে দেখ।
মাসুদ : (লম্বা পা ফেলে ড্রয়িং রুমে এলো) বাবা! মা!! (পায়ে সালাম করতে
করতে) আমার যে কী আনন্দ লাগছে!
সাকিমুন : বাবা, ছোট চাচি ফুমনিও এসেছে।

মাসুদ : তাই নাকি! (আবার কলিং বেলের শব্দ) সাকি, দেখ না কে এলো।
সাকিমুন : (দৌড়ে দরজা খুলতে যায়, দরজা খুলেই মাহমুদকে দেখে) আরে
চাচ্চু!
মাহমুদ : হ্যারে সাকি, কেমন আছিস? তোমার বাবা এসেছে?
সাকিমুন : ওই তো সামনের ঘরে। আজ আমার নাচতে ইচ্ছা করছে চাচ্চু!
(সাকেরা সবার হাতে হাতে নাশতা দিতে দিতে বলে)
সাকেরা : আমরা সবাই সামনের ঘরে বসি? বাবা মা ওখানে আছেন।
শাওন : হ্যাঁ ভাবি চল।
সবাই সামনে ঘরে এসে বসে উৎসবের আমেজে গল্প গুজব করতে লাগলো।
এসময় আবার কলিং বেলের শব্দ। সাকিমুন দৌড়ে গেলো।
সাকিমুন : ওহ আপনি!
আলী আকবর: তুমি কেমন আছো সাকি?
সাকি : জি ভালো। সবাই সামনের ঘরে বসেছে।
সাকেরা : (সবার সামনে খাবার) বাবা, মা, আমরা এখন শুরু করতে পারি?
আলী আকবর: (গলা ছেড়ে) প্লিজ দুই মিনিট পর।
সবাই তার দিকে তাকালো।
আলী আকবর : আপনারা সবাই একটু দাঁড়ান। আমি একটা ছবি তুলবো।
গ্রুপ ছবি। আপনারা কিন্তু হাসবেন। মেকি হাসি না, সত্যিকারের
হাসি…
(সবাই দাঁড়ালো।) সবার মুখে হাসি!
আলী আকবর তার ক্যামেরায় আনন্দমাখা গ্রুপ ছবি তুললো। (কাট)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *