কাঁচা মরিচ এখন লাটবাহাদুর

দ্রব্যমূল্য নিয়ে একটি কাল্পনিক গল্প রঙ্গব্যঙ্গ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো।

পেঁয়াজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।

বেগুন তার পাশ দিয়ে হনহন করে হেঁটে যাওয়ার সময় বলে, কিরে ভাই পেঁয়াজ, অমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিস যে! পায়ে কী হয়েছে?
পেঁয়াজ চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে, কথায় আছে না, হাতি যখন খাদে পড়ে চামচিকাও লাথি মারে। আমার সে অবস্থা হয়েছে। এখন তো আমার দাম কম, তাই আমার বস দুইখানা চড় দিয়া রাস্তায় ফিক্কা মারছে। উহু! কী যে ব্যথা পাইছি! আরে আরে বেগুন ভাই, চলে যাচ্ছ যে! আমার বাকি কথাগুলো শুনে যাও!

বেগুন বলল, নারে ভাই, আমার এত সময় নাই।

পেঁয়াজ অনুযোগের সুরে বলে, ও, বুঝছি বুঝছি! তোমারও দাম বাড়ছে, তাই না? তবে এই দিন দিন না। ভুঁইয়া বাড়িতে যাইবা না? তখন হাঁড়ির মধ্যে ফালাইয়া জাতা দেব-নে!

বেগুন হো হো করে হেসে দিয়ে বলল, ওই সব ছোটলোকের বাড়িতে আমি যাই নাকি! আমাদের একটা ইজ্জত আছে না!

পেঁয়াজ বলল, হ, দাম বাড়লে সবাই ওই কথাই বলে। আমরা কিন্তু মানুষের বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে সব সময়ই তাদের সঙ্গে থাকি। তোমাগো মতো ডাঁট দেখাই না।

বেগুন টিপ্পনী কেটে বলে, ডাঁট দেখানোর কিছু থাকলে তো দেখাইবা।

বেগুন কথা শেষ করতে না করতেই পটোল তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। পটোল পেঁয়াজকে দেখে বলল, কি হে পেঁয়াজ ভাই, তোমার পা ভাঙল কে?

পটোলের কথায় পেঁয়াজের ভীষণ মেজাজ গরম হলো। কিন্তু তার দরদাম কম বলে মেজাজ দেখাল না। সে সহজ-সরল ভঙ্গিতেই বলল, না ভাই, কেউ পা ভাঙে নাই। আমার বস রাস্তার ওপর ফিক্কা মারছে। তাতে একটু ব্যথা পাইছি। আচ্ছা শোনো পটোল ভাই!

পটোল হনহন করে চলে যেতে যেতে বলল, আরে, আমার শোনার সময় নাই। বড় সাহেবের বাড়িতে যাচ্ছি। অনেক দিন পর দাওয়াত পাইছি।

পেঁয়াজ বলল, হ বুঝছি। তোমারও দাম বাড়ছে, তাই না?

পটোল কোনো কথা না বলে চলে গেল। এর মধ্যেই বিদ্যুতের গতিতে পেঁয়াজের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল কাঁচা মরিচ। হঠাৎ পেঁয়াজের গায়ে পা পড়ে পিছলে গেল। আর অমনি বিরক্তির সঙ্গে বলল, উহু! রাস্তাঘাটে তো তোমাদের জন্য হাঁটাও যাইব না! কী হইছে তোমার? কোমর ভাঙছে নাকি?

না কাঁচা ভাই, পায়ে একটু মোচড় লাগছে। ওকি ওকি! নাক ধরলা কেন?

তোমার গা থেকে অমন গন্ধ আসছে কেন? পচন ধরছে নাকি?

হ, আমার তো এখন দাম কম। তাই আমার গা থেকে গন্ধ আসতেছে, তাই না কাঁচা ভাই?

তোমার দাম ছিল কবে? সব সিজনেই তো তোমার এক অবস্থা!

কেন? রোজার সময় তো পুরো মাসই আমি ফর্মে থাকি। কই, তখন তো আমি ডাঁট মারি না! যদিও ডাঁট মারার অনেক কিছুই আমার আছে। কারণ আমাকে ছাড়া তোমাদের কোনো মূল্য আছে? আমি না থাকলে তোমাদের মানুষ পুছত? তোমাকে ছাড়া রান্নাবান্না ঠিকই হয়। কিন্তু আমাকে ছাড়া কিছুতেই সম্ভব না। কোথায় আমি ডাঁট মারব তা না, তোমরা আমার সঙ্গে ডাঁট মারো! গরিবের হাতে পয়সা হলে যা হয়! তোমাদের সেই অবস্থা হয়েছে।

কাঁচা মরিচ ধমকের সুরে বলল, এই, তুমি খুব বেশি কথা বলো। এখন থেকে আমাকে সব সময় সালাম দিয়া চলবা। বুঝতে পারছ? তা না হলে কিন্তু খবর আছে!

পেঁয়াজ বলল, কেন তোমারে সালাম দিয়া চলতে হইব, তুমি লাটবাহাদুর নাকি?

কাঁচা মরিচ খুব ভাব নিয়ে বলল, অবশ্যই লাটবাহাদুর। আমার দাম কত, জানো?

কত? পেঁয়াজ জানতে চাইল।

তিন শ টাকা কেজি। তোমার কয় গুণ, হিসাব করে দেখো।

এ জন্যই তুমি এত ভাব দেখাও! তাই না কাঁচা ভাই?

আবার উল্টাপাল্টা কথা বলিস! এই, কাঁচা ভাই কী রে? এখন থেকে জাহাঁপনা বলবি। ঠিক আছে?

জি জাহাঁপনা!

কাঁচা মরিচ আর দাঁড়াল না। সে ভাব নিয়ে গটগট করে হেঁটে চলে গেল। তার চলে যাওয়া দূর থেকে দেখল শসা। সেও লাটসাহেবের মতো স্যুটেট-বুটেট হয়ে পেঁয়াজের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। তাকে দেখে পেঁয়াজ গলা ছেড়ে ডাক দিল। শসা ভাই, শসা ভাই!

শসা দেখেও না দেখার ভান করল। কিন্তু পেঁয়াজ তার পিছু ছাড়ল না। তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, কী হয়েছে? এত ভাব দেখাচ্ছ কেন? তোমার অবস্থা দেখে তো মনে হয় ঢাকাই ফিল্মে নায়কের পার্ট গাইবা!

শসা বলল, অবস্থা সে রকমই।

দাম বাড়ছে, তাই না?

আবার জিগায়! কেজিতে দেড় শ। বুঝছ কিছু? আর এইডা তো স্বাভাবিক ব্যাপার! বড়লোক ছাড়া তো আমরা চলাফেরাই করি না।

হঠাৎ নাকে রুমাল দিয়ে শসা বলল, এই, কাছে এসো না! কাছে এসো না!

কেন, কী হয়েছে? পেঁয়াজ জানতে চায়।

আবার জিজ্ঞেস করো। বোঝো না কিছু! তোমার গা থেকে গন্ধ আসছে। ঠিক আছে। আমি গেলাম।

শসা চলে গেল। পেঁয়াজ এক দৃষ্টিতে শসার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল, আমারও দাম বাড়তেছে। সময় আসুক। তখন এর জবাব দেব।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *