রাজনীতির চাল বোঝা বড়ই কঠিন। কে কোন দিকে খেলে, তা বুঝে উঠতে পারি না। এও নাকি ভোটের রাজনীতি! কেউ জামায়াত, আবার কেউ হেফাজত নিয়ে টানাটানি করছে। এই কাণ্ড দেখে আমরা সাধারণ মানুষ পড়ি গোলকধাঁধায়। আসলে রাজনীতিবিদরা আমাদের ঘোল খাইয়ে এমন বুঁদ বানিয়ে রেখেছেন যে আমরা ঢোঁড়া সাপ হয়ে গেছি। ফোঁস করার কোনো কায়দা নেই।

ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে এবং পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকের একটা সময় পর্যন্ত মুসলিম লীগের স্বর্ণযুগ ছিল। দেশ ভাগে মুসলিম লীগ বিশাল ভূমিকা রেখেছে। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক যদি লাহোর প্রস্তাব না করতেন, তাহলে পাকিস্তান এত দ্রুত আলাদা রাষ্ট্র হতো কি না সন্দেহ।

দেশভাগের প্রাক্কালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার উত্তাপ পাকিস্তান সৃষ্টির পরও ছড়িয়েছিল। একদিকে দাঙ্গা পরিস্থিতি আর অন্যদিকে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের উৎপাতে দেশের মানুষ যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল তখন প্রগতিশীল চিন্তাধারার নেতারা বিকল্প ভাবতে শুরু করলেন। সেই বিকল্প ভাবনা থেকেই জন্ম হয় আওয়ামী মুসলিম লীগের। মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের নিয়ে আলাদা দল গঠনের উদ্যোগ নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেটা ১৯৪৮ সালের কথা।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আসাম থেকে মুক্তি পেয়ে নিজের গ্রামের বাড়ি সন্তোষে অবস্থান করছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর কাছে ছুটে যান। তাঁকে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। সেই সঙ্গে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হন। জেলায় জেলায় সভা-সমাবেশ করে জনমত গড়ে তোলার কাজটি করেন বঙ্গবন্ধুই। ১৯৪৯ সালে ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয় মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের প্রাণের সংগঠন হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ।

১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগ অন্যান্য দলের সঙ্গে জোট বেঁধে গঠন করে যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্ট নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে। সেই নৌকা ফুটো করতে কত রকম ষড়যন্ত্র যে হয়েছিল, তা ইতিহাস ঘাঁটলে সবাই দেখতে পাবে। কিন্তু হক-ভাসানীর জনপ্রিয়তার জোয়ারে নৌকা তরতর করে লক্ষ্যে পৌঁছে যায়, আর মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ঘটে।

সেই আওয়ামী লীগ যখন ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গেও আঁতাত করে, তখন সত্যি সত্যিই আমাদের বিস্মিত হতে হয়! মনে মনে আক্ষেপ করি, রাজনীতি এত খারাপ জিনিস! ভোটের আশায় জোট! আবার সেই জোটে বিতর্কিত ব্যক্তি কিংবা দল!

আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে আশ্রয় নিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশের বিপুলসংখ্যক জামায়াতি নেতাকর্মী আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে মিশে গেছে। বিএনপি থেকেও অনেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছে, পদ-পদবি পেয়েছে। এসব হাইব্রিড নেতাকর্মীর কারণে আওয়ামী লীগের পোড় খাওয়া নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, যাঁদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে আওয়ামী লীগ এবং এই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অতীতে যাঁরা জেল-জুলুম খেটেছেন, নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাঁরা এখন থেকেও যেন নেই।

শাসকদলের নেতাদের মুখেই বিভিন্ন সময় শুনে আসছি, আওয়ামী লীগে কাক ঢুকেছে। হাইব্রিডদের নিয়েও কম লেখালেখি হয়নি। এখন শুনছি আওয়ামী লীগে ফার্মের মুরগিও ঢুকেছে।

শাসকদলের কাছে আমার একটা বিনীত জিজ্ঞাসা, জামায়াত কিংবা হেফাজত কি কোনো দিন আওয়ামী লীগের নৌকায় ভোট দেবে? নৌকার নাম শুনলেই তো তাদের গায়ে জ্বর ওঠে! অন্তর্জ্বালা বেড়ে যায়! তাদের কেন দুধকলা দিয়ে পোষা হচ্ছে? তাদের বিশ্বাস করা মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। সুযোগ পেলে সাপের মতো তারা ছোবল মারবেই।

কথায় বলে না, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে!’ ক্ষমতাসীন দল সেই শত্রুকেই হয়তো দুধকলা দিয়ে পুষছে। হেফাজত যে পরিমাণ গুরুত্ব পাচ্ছে এবং যত্ন-আত্তি করা হচ্ছে, তা দেখে মনে হচ্ছে, ক্ষমতার নাটাই বুঝি তাদেরই হাতে! হেফাজত হাতছাড়া হলে ক্ষমতাও হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে!

একসময় হেফাজতের সঙ্গে বিএনপিরও বেশ মাখামাখি ছিল। হেফাজতের সব দাবি মেনে নিয়েছিল খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এসংক্রান্ত একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতের ঘোর আপত্তিতে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তবে বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের ঘনিষ্ঠতা বরাবরই ছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে হেফাজত ঢাকা অভিমুখে যাত্রা এবং শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ করে। সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিএনপির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা ছিল। হেফাজতের নেতাকর্মীদের খাবার ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার জন্য তখন খালেদা জিয়া ঢাকাবাসীর প্রতি অনুরোধও জানিয়েছিলেন।

তখন সরকার কঠোর হাতে হেফাজতের কর্মসূচি বানচাল করেছিল। তার পর থেকে হেফাজত নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কিন্তু তারা মদিনা সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়া জানিয়ে আসছিল সরকারের কাছে। সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকজন নেতা হেফাজতের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখেন। তাদের দাবিদাওয়া মানা না-মানা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে আসছিলেন। হঠাৎ কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় পাল্টে গেল প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তকের কারিকুলাম!

কী অবাক কাণ্ড! কেউ এর দায় নিতে চাইল না। সবাই বলছে, ওপরের নির্দেশ! সেই ওপর কত দূর, তা কেউ জানে না। নিশ্চয়ই এটা কোনো গায়েবি নির্দেশ নয়!

আমাদের বাংলা ভাষার প্রথম পাঠ ‘আদর্শলিপি’। আমরা ছোটবেলায় আদর্শলিপিতে পড়েছি, ‘অ তে অজগর। অজগর ঐ আসছে তেড়ে। ’

এটা পরিবর্তন করে যা করা হয়েছে তা হলো, ‘অ তে অজ (ছাগল)। ’

এমনও তো হতে পারে, অজগর শব্দ ব্যবহারের নেপথ্যে রাজনৈতিক কারণ ছিল! দেশভাগের পর আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ওপর যারা আঘাত হানতে চেয়েছিল, তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে এটা তখন করা হয়েছিল! হতে পারে না?

এই মুহূর্তে কী এমন জরুরি প্রয়োজন পড়ল যে অজগরকে ‘ছাগল’ বানিয়ে দেওয়া হলো?

এ ধরনের হাস্যকর পরিবর্তন করে সরকারই মানুষের কাছে হাসির পাত্র হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া অতিসম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের প্রধান আল্লামা শফীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে। সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাদের সব ‘আবদার’ মেনে নেন। তারা অভিযোগ করেছে, উচ্চ আদালতের সামনে যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে, সেটি নাকি গ্রিক (ভাস্কর্য) মূর্তি!

এ বিষয়ে ভাস্কর্য নির্মাতা মৃণাল হক নিজেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা এক বাঙালি রমণীর ভাস্কর্য। জাস্টিশিয়ার আদলে করা বাঙালি রমণীর হাতে ন্যায়বিচারের প্রতীক। তার পরও কেন বলা হচ্ছে গ্রিক মূর্তি, তা বুঝতে পারছি না। আর হেফাজতের অন্ধ বিরোধিতার কারণে ভাস্কর্যটি সরাতে হবে কেন? দুদিন পর তো তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যও সরাতে বলবে। বলবে, ওসব মূর্তি রাখা ইসলামে নাজায়েজ! তখন কী হবে?

সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ বেশ অস্বস্তিতে আছে। অনেকেই বলতে শুরু করেছে, আওয়ামী লীগ কি তাহলে সেই পঞ্চাশের দশকে ফিরে যাচ্ছে? অতি-হেফাজতপ্রীতিতে আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল অংশটিকে হারাবে! তখন তো আমও যাবে, ছালাও যাবে! সেই বিষয়টি কি আওয়ামী লীগ নেতাদের বিবেচনায় আছে?

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য সম্পর্ক মানতে পারছে না বিএনপিও। তাই বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগের সমালোচনা করছেন। নিজেরা যখন তাদের দাবিদাওয়া মেনে নিয়েছিলেন, তখন মনে ছিল না তাঁরা কী করতে যাচ্ছেন। বিএনপির জামায়াতপ্রীতি নিয়েও অনেক লেখালেখি হয়েছে। কোনো কাজ হয়নি। ফলে বিএনপির মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল ধারার অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। অনেক সমর্থকও বিএনপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

বিএনপির অনেক নেতা এ কথা স্বীকার করে বলেছেন, জামায়াতপ্রীতির কারণে দলটিকে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। আওয়ামী লীগকে খেসারত দিতে হবে বলে অনেকে মনে করে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষ আওয়ামী লীগের ‘হেফাজতপ্রীতি’ ভালোভাবে নেয়নি। অনেকে বলছে, যার পরামর্শেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক না কেন, এটা আওয়ামী লীগের জন্য আত্মঘাতী হবে।

আওয়ামী লীগ যাঁর হাতে, তিনি না বুঝলে অন্যরা যতই চেঁচামেচি করুন, কাজ হবে না। তিনি যদি বলে বসেন, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি থাকা ঠিক না। তিনি নেতা। তিনি অনেক দূর দেখতে পান। হয়তো ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই হেফাজতকে কাছে টেনেছেন!

Print Friendly