ঘটনা সত্য। কিন্তু গল্পটি কাল্পনিক। এই গল্পের নায়ক হচ্ছে পুলিশ। তবে একজন নয়, একাধিক পুলিশ।

ঘটনাটি কোনো এক রাতে ঘটেছিল। রাত ১০টার দিকে কয়েকজন পুলিশ রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল আর গল্প করছিল। তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এক কিশোর। নাম পলাশ। তার বয়স ১১-১২ বছর হবে। নিরীহ গোবেচারা টাইপ। ঢাকা শহরের কুড়িল বস্তিতে তার জন্ম। ওর বাবা প্রাইভেট কারের ড্রাইভার। ওর মা আর ছোট একটা ভাই আছে। তারা বাসায় থাকে। ওর বাবার একার আয়ে চার সদস্যের সংসার চলে না। তাই পলাশও কাজে যোগ দেয়।

পলাশের হাতে ছোট্ট একটা টিফিন ক্যারিয়ার। সকালে কাজে যাওয়ার সময় বাসা থেকে খাবার নিয়ে যায়। সেই খাবার দুপুরে খায়। বাসা থেকে কাজের জায়গা দুই-আড়াই কিলোমিটারের পথ। বাসে বা রিকশায় গেলে প্রতিদিন টাকা খরচ হবে। তাই সে হেঁটে হেঁটেই যাওয়া-আসা করে। যাতায়াতের পয়সা দিয়ে ছোট ভাইটিকে স্কুলে পড়ায়।

বাসায় যাওয়ার পথে হঠাৎ পুলিশের ডাকে থমকে দাঁড়ায় পলাশ। এক পুলিশ ধমকের সুরে তাকে বলে—এই, তোর নাম কী?

পলাশ।

এত রাইতে কই যাস?

বাসায় যাই।

কই গেছিলি?

কামে গেছিলাম।

কোথায় কাজ করস?

দোকানে।

দোকান তো কত আগেই ছুটি হইছে!

হ। আগেই হইছে। আমি হাঁইট্যা হাঁইট্যা যাই তো!

এই! তুই ইয়াবা খাস! সত্য কইরা ক!

ইয়াবা কারে কয়?

ইয়াবা কারে কয় মানে! তুই জানস না?

না। সত্যই কইতেছি স্যার, আমি জানি না।

এক চড় দিয়া দাঁত ফালাইয়া দিমু। ক, তুই ইয়াবা খাস?

আমি জানি না, স্যার!

এর মধ্যেই পুলিশ কষিয়ে এক চড় বসিয়ে দিল ছেলেটির গালে। আর ছেলেটির প্যান্টের পকেটে কয়েক প্যাকেট ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে বলল—ক, তুই ইয়াবা খাস!

গালে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটি বলে, হ স্যার, খাই।

চল, আমাগো লগে থানায় চল। আর শোন, তোর মা-বাবা জিজ্ঞেস করলেও বলবি, তুই ইয়াবা খাস। সে জন্য তোরে ধরছি। আর যদি উল্টাসিধা কস, তাইলে কিন্তু কঠিন মাইর!

পুলিশই পলাশের মা-বাবাকে থানায় খবর দিল। থানায় ছেলে আটকা! খবর শুনে মা-বাবার অস্থির অবস্থা। কী করল ছেলেটা! পুলিশের কাছে খবর শুনে তাদের মাথায় হাত! বিশ্বাসই করতে পারছেন না, তাঁদের অতটুকু ছেলে এমন কাণ্ড করবে।

পুলিশ বলে, বিশ্বাস না হলে আসেন ছেলের কাছে। ওর কাছেই শোনেন, ও ইয়াবা খায় কি না! এই বল, তুই ইয়াবা খাস না!

পলাশ চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলে—হ, খাই।

পলাশের মা-বাবা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাঁরা পলাশকে খুব ভালো করে চেনেন। ও ইয়াবা খায়—এ কথা তাঁরা কিছুতেই বিশ্বাস করেন না। কিন্তু পুলিশের এককথা, পলাশ ইয়াবা খায়। ওর পকেটেও ইয়াবা পাওয়া গেছে।

পলাশের বাবা বলেন—স্যার, আমি কথা দিতেছি, আমার ছেলে আর ইয়াবা খাইব না! ওরে ছাইড়া দেন।

পুলিশের পাল্টা ধমক, কী! ছাইড়া দিমু? থানায় আনছি কি ছাইড়া দেওয়ার জন্য? টাকা-পয়সা খরচ কর। তা না হইলে সোজা কোর্টে চালান কইরা দিমু।

পলাশের বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলেন—স্যার, আমি গরিব মানুষ। কোথায় টাকা-পয়সা পামু?

পুলিশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলে, যাও যাও! কথা বাড়াইয়ো না। আমাগো অনেক কাজ আছে।

পলাশের মা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলেন—স্যার, আপনেগো পায়ে পড়ি। আমার ছেলেডারে ছাইড়া দেন!

ইয়াবা মামলার আসামি! মুখের কথায় ছাইড়া দেওয়া যায়! আগে টাকা-পয়সা কিছু ছাড়ো। তারপর দেখি কী করা যায়!

পলাশের বাবা হাজারখানেক টাকা পুলিশের হাতে গুঁজে দিয়ে বলেন—নেন স্যার। যা আছিল সব দিছি। এইবার আমার ছেলেডারে ছাড়েন।

পুলিশ টাকা ফিক্কা মারে পলাশের বাবার দিকে। তারপর বলে, এই সব কী দিতেছেন? এতে হইব না। তিন-চারজন মানুষ! সাত-আট হাজার টাকার কমে কেমনে হয়?

পলাশের বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলেন—স্যার, আমি গরিব মানুষ! ড্রাইভারি কইরা সংসার চালাই! আমি টাকা কোথায় পামু?

আরেক পুলিশ তেড়ে এসে বলে, তা আমরা কী জানি? ভদ্রভাবে কইতেছি, তাই কানে যায় না। তাই না! যাও যাও! কোর্টে যাও। ওখানে গিয়া ফয়সালা করো। আমরা আসামি কাল কোর্টে চালান কইরা দিমু।

পলাশের বাবা ভাবেন, কোর্টে চালান করলে ঝামেলা আরো বাড়বে। তাই ধারকর্জ করে হাজার পাঁচেক টাকা পুলিশের হাতে দিয়ে ছেলেকে ছাড়ালেন। তারপর বুকে টেনে নিয়ে বললেন—বাবা, তুই সত্যি কইরা ক তো! তুই কি ইয়াবা খাইছস?

পলাশ কাঁদতে কাঁদতে বলে, এই তোমার মাথায় হাত দিয়া কইলাম, আমি ইয়াবা চিনিও না!

Print Friendly